ইসরাইল ও গ্রিসের মধ্যে সামরিক সম্পর্কের সম্প্রসারণ গাজার আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিসি) চলমান গণহত্যা মামলার সঙ্গে সমান্তরালে ঘটছে। গাজা অঞ্চলে ইসরাইলি বাহিনীর অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সময় দু’দেশ কেবল অস্ত্র ক্রয় নয়, যৌথভাবে অস্ত্র উন্নয়নের পরিকল্পনাও এগিয়ে নিচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো উভয় দেশের নিরাপত্তা কৌশলকে পুনর্গঠন করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
আইসিসি-তে গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি নিয়ে মামলায় বিচার চলছে। একই সময়ে গ্রিসের পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাঞ্জেলোস সিরিগোস ইসরাইলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে গ্রিস ইতিমধ্যে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা পণ্যের বড় গ্রাহক এবং যৌথ উৎপাদন ও পরিকল্পনা শুরু হলে সম্পর্কের উন্নতি ত্বরান্বিত হবে।
গত ৪ ডিসেম্বর গ্রিসের প্রতিরক্ষা কমিটি ইসরাইল থেকে ৩৬টি পিইউএলএস রকেট আর্টিলারি সিস্টেম ক্রয়ের অনুমোদন দেয়, যার মোট মূল্য প্রায় ৭৬ কোটি ডলার। এটি এখন পর্যন্ত ইসরাইল থেকে গ্রিসের সর্ববৃহৎ একক অস্ত্র ক্রয় হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। এই রকেট সিস্টেমগুলো গ্রিসের পূর্বে ঘোষিত ৩৩০ কোটি ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা প্রকল্প “শিল্ড অফ অ্যাকিলিস”-এর অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে।
শিল্ড অফ অ্যাকিলিস প্রকল্পের অধীনে গ্রিসের আকাশ রক্ষা ব্যবস্থা তিন স্তরে গঠিত হবে। প্রথম স্তরে স্পাইডার, দ্বিতীয় স্তরে বারাক এবং তৃতীয় স্তরে ডেভিডের স্লিং অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোর মোট মূল্য প্রায় ৩৫০ কোটি ডলার। এই তিনটি সিস্টেম একসাথে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য আকাশপথের হুমকি মোকাবেলায় কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গ্রিসের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নিকোস দেনদিয়াস ২০ জানুয়ারি ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে জানান যে গ্রিস এখন কেবল ক্রেতা নয়, বরং কম খরচে উদ্ভাবনী পণ্য যৌথভাবে উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন যে উভয় দেশ একে অপরের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ব্যবহার করে নতুন অস্ত্র সিস্টেমের গবেষণা ও উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করতে চায়।
ইসরাইল ও গ্রিস উভয়ই তুরস্ককে আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। তুরস্কের সামরিক কার্যক্রমের প্রতি উদ্বেগের ফলে দুই দেশ কূটনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে তুলেছে। একই সময়ে সাইপ্রাসও তুরস্ককে হুমকি হিসেবে দেখে, এবং গ্রিস-ইসরাইল-সাইপ্রাসের ত্রিপক্ষীয় সমন্বয়কে “তুরস্ক বিরোধী” জোটের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০২৪ সালে ইসরাইল-তুরস্ক সম্পর্কের অবনতির পর থেকে গ্রিস ও ইসরাইল যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করেছে। এই মহড়াগুলোতে উভয় দেশের বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী ও স্থলবাহিনীর সমন্বিত কৌশল পরীক্ষা করা হয়, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্য বহন করে।
গ্রিসের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্দ্রা পাপাদোপোলো এক সাক্ষাৎকারে দুই দেশের সামরিক সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গ্রিসকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সেতু হিসেবে অবস্থান করতে সাহায্য করবে।
ভবিষ্যতে গ্রিস ও ইসরাইলের যৌথ গবেষণা ও উৎপাদন প্রকল্পগুলোতে আরও বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। উভয় দেশ নতুন প্রযুক্তি, যেমন ড্রোন ও সাইবার নিরাপত্তা, ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। এই পদক্ষেপগুলো আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।
সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি দুই দেশ কূটনৈতিক স্তরে সমন্বয় বাড়িয়ে তুরস্কের সম্ভাব্য আক্রমণাত্মক নীতির মোকাবিলায় সমন্বিত নীতি গড়ে তুলছে। এই কৌশলগত জোটের ফলে গ্রীসের ইউরোপীয় নিরাপত্তা নেটওয়ার্কে অবদান বাড়বে এবং ইসরাইলের মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থান শক্তিশালী হবে।
সামগ্রিকভাবে, গাজার আইসিসি মামলার সময়ে ইসরাইল-গ্রিস সামরিক সম্পর্কের ত্বরান্বিত হওয়া উভয় দেশের কৌশলগত স্বার্থের সমন্বয়কে নির্দেশ করে। এই সহযোগিতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোকে পুনর্গঠন করে এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



