সেরবিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল হোটেল গড়ার পরিকল্পনা সরকারী অনুমোদন থেকে আদালতের রায় পর্যন্ত একাধিক বাধার সম্মুখীন হয়ে শেষ হয়েছে। প্রকল্পটি মূলত শহরের কেন্দ্রের ঐতিহাসিক জায়গা জেনারেলস্ট্যাব (Generalstab) কমপ্লেক্সে নির্মাণের কথা ছিল, যেখানে ১৯৯৯ সালের ন্যাটো বোমা হামলার পর অবশিষ্ট ধ্বংসাবশেষ এখনও দৃশ্যমান। এই স্থাপনা সংস্কৃতি ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকায় নতুন নির্মাণের অনুমোদন পেতে বিশেষ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল।
জেনারেলস্ট্যাব কমপ্লেক্সটি পূর্বে সেরবিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দফতর হিসেবে ব্যবহৃত হতো, তবে ১৯৯৯ সালের বোমা হামলার ফলে তা আংশিকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও অর্ধেক কার্যকর অবস্থায় রয়ে যায়। সরকার এই ভবনকে সুরক্ষিত ঐতিহ্য তালিকা থেকে বাদ দিয়ে হোটেল নির্মাণের অনুমতি নিতে চেয়েছিল, তবে সংস্কৃতি মন্ত্রী নিকোলা সেলাকোভিচ (Nikola Selakovic) এই প্রক্রিয়ায় নথিপত্র পরিবর্তন ও মিথ্যা তথ্য প্রদান করে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগে আদালতে হাজির হয়েছেন।
প্রসিকিউশন দল নিকোলা সেলাকোভিচের বিরুদ্ধে অফিসের দায়িত্বের অপব্যবহার এবং নথি বিকৃতির অভিযোগে তিন বছরের কারাদণ্ডের দাবি জানিয়েছে। একই সময়ে রাষ্ট্রপতি আলেকসান্ডার ভুচিক (Aleksandar Vucic) আদালতের রায়ের পর মন্ত্রীকে দয়া করে মুক্তি দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যা রায়ের ওপর নির্ভরশীল। এই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান থাকায় হোটেল প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
আইনি বাধা এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ সংক্রান্ত বিরোধের ফলে ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল হোটেল বেলগ্রেডে কখনোই কার্যকর হতে পারবে না বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। প্রকল্পটি শুরু থেকেই কঠিন বিক্রয় পয়েন্টে ছিল, বিশেষ করে মার্কিন সরকার (Us Government) এবং সেরবিয়ার মধ্যে অতীতের উত্তেজনা বিবেচনা করলে। ১৯৯৯ সালে ন্যাটো বোমা হামলা জেনারেলস্ট্যাবকে ধ্বংসের পথে নিয়ে গিয়েছিল, যা সেরবিয়ার জনগণের মধ্যে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে।
এর পাশাপাশি, ২০০৮ সালে মার্কিন সরকার কসোভোর একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণাকে সমর্থন করার ফলে সেরবিয়ার জাতীয় গর্বে আঘাত লেগে যায় এবং মার্কিন প্রতি অবিশ্বাস বাড়ে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে ২০২৪ সালে সেরবিয়ার সরকার জ্যারেড কুশনার (Jared Kushner) ও তার অ্যাফিনিটি গ্লোবাল (Affinity Global) কোম্পানির সঙ্গে জেনারেলস্ট্যাব পুনর্নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষর করে আশ্চর্যজনকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
কুশনারের কোম্পানি যে পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিল, তাতে ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল হোটেলকে প্রকল্পের কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে গড়ে তোলার কথা ছিল। এই ঘোষণার পর সেরবিয়ার জনমত দ্রুত বিরোধে রূপান্তরিত হয়, কারণ অনেক নাগরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এই উদ্যোগকে অতীতের কষ্টের উপরে নতুন স্বপ্ন গড়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন না।
অধিকন্তু, ভুচিক সরকার ১৯৯৯ সালের বোঝা অতিক্রম করার জন্য সময় উপযুক্ত বলে দাবি করে, এবং বেলগ্রেডে মার্কিন সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। তিনি গত বছর ব্রিটিশ সম্প্রচার সংস্থাকে জানিয়েছিলেন যে তার প্রগতিশীল পার্টি মার্কিন সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে প্রস্তুত। তবে এই মন্তব্যের পরেও প্রকল্পের বাস্তবায়নকে বাধা দেয়া আইনি প্রক্রিয়া এবং জনমতের বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
এই ঘটনাটি সেরবিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন আলোচনার সূচনা করেছে। সরকারী পক্ষের মতে, হোটেল প্রকল্পটি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পর্যটন শিল্পকে উন্নত করার একটি সুযোগ ছিল। অন্যদিকে, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ সমর্থক এবং জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভের ধ্বংসকে জাতীয় পরিচয়ের আঘাত হিসেবে দেখছে।
আসন্ন আদালতের রায় এবং ভুচিকের সম্ভাব্য দয়া-অনুদানের সিদ্ধান্ত সেরবিয়ার ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদি মন্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং দয়া-অনুদান না দেওয়া হয়, তবে ট্রাম্প হোটেল প্রকল্পের পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। অন্যদিকে, যদি রায় হালকা হয় এবং দয়া-অনুদান প্রদান করা হয়, তবে সরকার পুনরায় বিনিয়োগের পথ অনুসন্ধান করতে পারে, যদিও জনমতের বিরোধ অব্যাহত থাকবে।
সারসংক্ষেপে, বেলগ্রেডে ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল হোটেল গড়ার পরিকল্পনা সংস্কৃতি ঐতিহ্য সংরক্ষণ, আইনি বাধা এবং মার্কিন-সেরবিয়ার ঐতিহাসিক সম্পর্কের জটিলতার কারণে এখনো অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। ভবিষ্যতে কী হবে তা নির্ভর করবে আদালতের রায়, রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং জনমতের সমন্বয়ের ওপর।



