চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান কর্মবিরতির ফলে বন্দর ব্যবহারকারী সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কর্মবিরতি টানা কয়েক দিন ধরে চলতে থাকায় রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হয়েছে এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে বুধবার সন্ধ্যায় নগরীর আগ্রাবাদে একটি হোটেলে ব্যবহারকারী প্রতিনিধিরা ও বন্দর কর্মী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকটি প্রায় চার ঘণ্টা স্থায়ী হয় এবং এতে বন্দর ব্যবহারকারীদের প্রধান উদ্বেগগুলো বিশদভাবে আলোচনা করা হয়। তারা উল্লেখ করেছে যে, দেশের সামনে নির্বাচনের দিন আসছে, ত্রিদিবসের ছুটি এবং রমজানও দ্রুত নিকটবর্তী। রমজানের সময় পণ্যের ডেলিভারি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়লে গ্রাহকদের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টরের জন্য বড় ঝুঁকি।
গার্মেন্টস শিল্পের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র ১৮ দিন এবং মার্চে ১৬-১৭ দিন কাজ করা সম্ভব হবে। যদি বন্দরের বন্ধ অব্যাহত থাকে, তবে বর্তমান পণ্যগুলো বাজারে পৌঁছাবে না এবং ভবিষ্যৎ পণ্যগুলোর প্রবাহও থেমে যাবে। ফলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে, বিশেষ করে রমজানের উসিলায় পুরো দেশব্যাপী ভোক্তাদের উপর প্রভাব পড়বে।
বন্দরের চার্জ ও ফি সম্পর্কেও ব্যবহারকারীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা জোর দিয়ে বলেছেন, বন্দর বন্ধ থাকলে সৃষ্ট অতিরিক্ত খরচের দায়ভার প্রথমে ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ওপর পড়বে, এবং শেষ পর্যন্ত তা ভোক্তাদের ওপর হস্তান্তরিত হবে। তাই তারা এই বিষয়গুলো সরকারে তুলে ধরার জন্য একটি যৌথ দাবি প্রস্তুত করেছে।
বিএমইইএর সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি এম এ সালাম বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবং ব্যবহারকারীদের উদ্বেগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বন্দর যদি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে বাণিজ্যিক লেনদেনের উপর চাপ বাড়বে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি আরও বলেন, ব্যবহারকারীরা যে দাবিগুলো উপস্থাপন করেছে, সেগুলো যুক্তিসঙ্গত এবং সরকারকে এগুলো বিবেচনা করা উচিত।
এনসিটি (ন্যাশনাল কন্টেইনার টার্মিনাল) নিয়ে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, তা নিয়ে সালাম মন্তব্য করেন। তিনি জানান, কিছু শ্রমিককে বদলি করা হয়েছে এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষের কারণ। এই বিষয়গুলো সমাধান না হলে কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়, তাই দ্রুত আলোচনা শুরু করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বক্তব্যে তিনি আরও উল্লেখ করেন, যদি এনসিটি সংক্রান্ত বড় আকারের আলোচনা শুরু হয় এবং সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়, তবে শ্রমিকরা তৎক্ষণাৎ কাজ শুরু করতে ইচ্ছুক। এভাবে বন্দর কার্যক্রম পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে এবং রপ্তানি-আমদানি লেনদেনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বকে দেশের লাইফলাইন হিসেবে উল্লেখ করে, সালাম বন্দর চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করেন যে, ৯০ শতাংশ রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রমের জন্য বন্দর বন্ধ রাখা চার দিন পর্যন্ত চলা উচিত নয়। তিনি বলেন, পূর্বে এক-দু’দিনের বন্ধে জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ থেমে যায়নি, তবে এইবার প্রথমবার জাহাজের চলাচলই বন্ধ হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারের দৃষ্টিতে উদ্বেগের বিষয়।
বন্দর ব্যবহারকারীরা আশাবাদী যে, সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে দ্রুত সমাধান বের হবে। তারা জোর দিয়ে বলেছেন, বন্দর বন্ধের ফলে সৃষ্ট ক্ষতি শুধুমাত্র ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নয়, সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও প্রভাব ফেলবে। তাই সকল পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন, যাতে রমজান ও নির্বাচনের সময়কালে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত না হয়।
বাজার বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যদি বন্দরের বন্ধ অব্যাহত থাকে, তবে রপ্তানি-আমদানি পরিমাণে উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা যাবে এবং গার্মেন্টস সেক্টরের উৎপাদনশীলতা কমে যাবে। এছাড়া, রমজানের সময় পণ্যের ঘাটতি মূল্যের উত্থান ঘটাতে পারে, যা ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতাকে প্রভাবিত করবে।
সামগ্রিকভাবে, চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মবিরতি দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে এবং দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তুলেছে। ব্যবহারকারীরা সরকারকে অনুরোধ করছেন, যাতে বন্দর বন্ধের সময়সীমা কমিয়ে, রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা যায় এবং রমজান ও নির্বাচনের সময়কালে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি না থাকে।



