বরগুনা জেলার দুইটি সংসদীয় আসনে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে; আওয়ামী লীগ প্রার্থী না রেখে, ভোটের সমীকরণে নতুন খেলোয়াড় হিসেবে জামায়াত-এ-ইসলামি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারে। এই পরিবর্তন স্থানীয় ভোটার, পার্টি কর্মী এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ ও কৌতূহল উভয়ই জাগিয়ে তুলেছে।
প্রতিবেদনকারী দলটি পটুয়াখালীর গলাচিপা থেকে শাখারিয়া, আমতলী, বরগুনা সদর পার হয়ে পাথরঘাটা পর্যন্ত ট্রলার মাধ্যমে প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে। পাথরঘাটা, যা বলেশ্বর নদের শেষ প্রান্তে অবস্থিত, বরগুনার সবচেয়ে দূরবর্তী ও প্রবেশযোগ্যতা কম এলাকাগুলোর একটি। এই যাত্রায় গলাচিপা, পায়রা ও বিশখালী নদী পার হতে হয়েছে, যা স্থানীয় জনগণের দৈনন্দিন চলাচলের কঠিনতা তুলে ধরে।
বরগুনা জেলার অধিকাংশ জনসংখ্যা মৎস্যজীবী; উপকূলীয় চারটি উপজেলায় নদীপথ ছাড়া আর কোনো পরিবহন বিকল্প নেই। সরু ও ভাঙচুরে সড়ক দিয়ে বরিশাল শহরে পৌঁছানোও কঠিন, ফলে বাসস্থান ও বাজারে পৌঁছাতে নদীর ওপর নির্ভরতা অব্যাহত। তদুপরি, ২০০৭ সালের ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড়ে সিডরে ৬৩ জন প্রাণ হারায়, যা এলাকার দুর্যোগপ্রবণতা ও পুনরুদ্ধারের ধীরগতি নির্দেশ করে।
রাজনৈতিকভাবে বরগুনার দুইটি সংসদীয় আসনে ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়; বেশির ভাগ সময়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়লাভ করেছে। তবে এই বার আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভোটের গতি পরিবর্তিত হয়েছে। বিএনপি এখন এক আসনে ঐতিহ্যবাহী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, অন্য আসনে জামায়াত-এ-ইসলামি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে উত্থিত হয়েছে।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথোপকথনে জানা যায়, আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিএনপির কিছু নেতা ও কর্মীর চাঁদাবাজি, দখলদারিত্বের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এসব অভিযোগ ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলেছে এবং পার্টির অভ্যন্তরে বিরোধের সৃষ্টি করেছে। দুই আসনেরই বিএনপি প্রার্থীরা দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নেতৃত্বের বিরোধের কারণে অস্বস্তিতে রয়েছে।
জনসভায় দলীয় দুই গোষ্ঠীর নেতাদের বিরুদ্ধে তীব্র তর্ক দেখা গেছে; কিছু সমাবেশে এক গোষ্ঠীর সদস্য অন্য গোষ্ঠীর নেতাকে বিষাক্ত ভাষায় সমালোচনা করেছে। এই ধরনের উত্তেজনা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতাকে প্রভাবিত করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন।
বহু ভোটার জানান, নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানো নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন; বিশেষ করে দূরবর্তী গ্রাম ও নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় গাড়ি বা নৌকা না থাকলে ভোটদান কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে, কিছু ভোটার স্বীকার করেন যে দলীয় প্রচারাভিযানের চাপের ফলে তারা নির্দিষ্ট কোনো দলের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য হয়েছেন।
এই পরিস্থিতি বরগুনার রাজনৈতিক সমীকরণকে পুনর্গঠন করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে; জামায়াত-এ-ইসলামির অংশগ্রহণ ভোটের ফলাফলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। যদি জামায়াত-এ-ইসলামি উল্লেখযোগ্য ভোট সংগ্রহ করে, তবে তা বিএনপির ঐতিহ্যবাহী ভোটার ভিত্তি ক্ষয় করতে পারে এবং ভবিষ্যতে পার্টির কৌশল পরিবর্তনের দরকারি সংকেত দিতে পারে।
অবশেষে, নির্বাচনের ফলাফল বরগুনার স্থানীয় উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নের দিকেও প্রভাব ফেলবে। ভোটাররা আশা করছেন, নতুন প্রতিনিধি নির্বাচনের পর নদীভাঙন, পানির সংকট ও সড়ক সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এখনই সময় সুনির্দিষ্ট নীতি ও জনসেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আস্থা জয় করা।



