জনহপকিন্স স্কুল অফ মেডিসিনের গবেষকরা জানুয়ারি ১৫ তারিখে “Cell Communication and Signaling” জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় জানিয়েছেন যে, মুখের গাম রোগে যুক্ত একটি ব্যাকটেরিয়া ইঁদুরের স্তন ক্যান্সার টিউমারকে দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, একই ব্যাকটেরিয়া রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে দেহের অন্যান্য অংশে পৌঁছে, স্তন টিস্যুতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে, গামের স্বাস্থ্যের অবহেলা সরাসরি স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয়।
ফুসোব্যাকটেরিয়াম নিউক্লিয়েটাম (Fusobacterium nucleatum) গাম রোগের প্রধান কারণগুলোর একটি এবং এটি মুখের পৃষ্ঠে জটিল বায়োফিল্ম গঠন করে। এই বায়োফিল্ম দাঁত ও জিহ্বার ওপর স্লিমি স্তর তৈরি করে, যা গামের প্রদাহ ও রক্তস্রাবের কারণ হয়। পূর্বে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি মাথা ও গলা অঞ্চলের ক্যান্সার এবং অন্যান্য ক্যান্সার প্রকারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তবে স্তন ক্যান্সারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের প্রমাণ সীমিত ছিল।
গবেষক দল রোগীর ডেটাসেট বিশ্লেষণ করে দেখেছে যে, স্তন ক্যান্সার রোগীর টিউমারে F. nucleatum এর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই পর্যবেক্ষণ তাদেরকে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে যে, ব্যাকটেরিয়া টিউমারের মধ্যে কী ভূমিকা পালন করে। তাই, তারা ইঁদুরে সরাসরি পরীক্ষা চালিয়ে এই সম্পর্কের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি যাচাই করতে চেয়েছেন।
প্রথমে, গবেষকরা সুস্থ ইঁদুরের স্তন টিস্যুতে এই ব্যাকটেরিয়া ইনজেক্ট করে পর্যবেক্ষণ করেন। ফলস্বরূপ, ইঁদুরের স্তনে প্রদাহজনিত ক্ষত গঠন হয়, যা ক্যান্সার হওয়ার পূর্বধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও এই ক্ষতগুলো তৎক্ষণাৎ ক্যান্সার রূপ নেয়নি, তবে তাদের উপস্থিতি টিউমার গঠনের সম্ভাবনা বাড়ায়।
পরবর্তী পর্যায়ে, একই ব্যাকটেরিয়া রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে ইতিমধ্যে ছোট টিউমারযুক্ত ইঁদুরের শরীরে প্রবেশ করানো হয়। ছয় সপ্তাহের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ব্যাকটেরিয়া পেয়েছে এমন ইঁদুরের টিউমার গড়ে তিন গুণ বড় হয়ে ওঠে, যা ব্যাকটেরিয়া না থাকা নিয়ন্ত্রণ গোষ্ঠীর তুলনায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। এছাড়া, সবই ব্যাকটেরিয়া পেয়েছে এমন ইঁদুরের ফুসফুসে ক্যান্সার মেটাস্টাসের চিহ্ন দেখা যায়।
এই ফলাফলগুলো নির্দেশ করে যে, F. nucleatum রক্তের মাধ্যমে দেহের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে গিয়ে স্তন টিস্যুতে প্রবেশ করলে, স্বাভাবিক কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং বিদ্যমান টিউমারকে দ্রুত বৃদ্ধি করতে পারে। গবেষকরা ব্যাখ্যা করেন যে, ব্যাকটেরিয়া কোষের DNA-তে ক্ষতি করে, বিশেষ করে BRCA1 জিনে মিউটেশন থাকা কোষগুলোতে এই ক্ষতি বেশি তীব্র হতে পারে। ফলে, BRCA1 মিউটেশনযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে গামের ব্যাকটেরিয়া আরও বেশি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই গবেষণার প্রধান অবদান হল গাম রোগ ও স্তন ক্যান্সারের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা, যা পূর্বে শুধুমাত্র পরোক্ষ সম্পর্ক হিসেবে বিবেচিত হত। ব্যাকটেরিয়া রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে দেহের দূরবর্তী টিস্যুতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া এখন স্পষ্ট হয়েছে, এবং এটি ক্যান্সার টিউমারকে দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। এই ফলাফল ভবিষ্যতে ক্যান্সার প্রতিরোধে মুখের স্বাস্থ্যের গুরুত্বকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে, গাম রোগের নিয়মিত চিকিৎসা ও সঠিক মৌখিক স্বাস্থ্যবিধি ক্যান্সার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। দাঁত ব্রাশ করা, ফ্লস ব্যবহার করা এবং নিয়মিত ডেন্টাল চেক‑আপের মাধ্যমে গামের ব্যাকটেরিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। যদিও এই গবেষণা ইঁদুরে করা হয়েছে, তবুও মানবদেহে একই প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে কিনা তা নিশ্চিত করতে আরও ক্লিনিকাল গবেষণা প্রয়োজন।
অতএব, গামের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া শুধুমাত্র দাঁত ও মাড়ির রোগ প্রতিরোধে নয়, বরং সম্ভাব্য ক্যান্সার ঝুঁকি হ্রাসেও ভূমিকা রাখতে পারে। ভবিষ্যতে এই ধরনের গবেষণা মানবদেহে প্রয়োগযোগ্য হলে, গামের ব্যাকটেরিয়া লক্ষ্য করে নতুন থেরাপি বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বিকাশের সম্ভাবনা উন্মোচিত হতে পারে।
আপনার দৈনন্দিন জীবনে গামের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে কি যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছেন? নিয়মিত ডেন্টাল চেক‑আপ এবং সঠিক মৌখিক পরিচ্ছন্নতা আপনার সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে।



