দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশি উন্নয়ন সহায়তা হ্রাসের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যা ৫.৪ লাখের বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে। গবেষণাটি বিশ্বব্যাপী দাতা দেশগুলোর আর্থিক অবদান হ্রাসের সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করেছে। এই ফলাফল স্বাস্থ্য নীতি নির্ধারকদের জন্য সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে শিশুমৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে, যা মূলত দাতা সংস্থার অর্থায়নে চালিত স্বাস্থ্য কর্মসূচির ফল। টিকাদান, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পুষ্টি উন্নয়নের মাধ্যমে বহু দেশে মৃত্যুর হার হ্রাস পায়। তবে সহায়তার হ্রাস এই অর্জনগুলোকে বিপন্ন করতে পারে, বিশেষ করে সংক্রামক রোগ ও অপুষ্টি‑সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর ক্ষেত্রে।
গবেষণার ডেটা দেখায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য বড় দাতা দেশের অর্থায়নে পরিচালিত প্রোগ্রামগুলোই শিশুমৃত্যুহার হ্রাসে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। ল্যানসেটের বিশ্লেষণে দেখা যায়, দাতা অর্থের হ্রাস সরাসরি স্বাস্থ্য সেবার গুণগত মান ও পৌঁছানোর ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। ফলে, কম সহায়তা পাওয়া দেশগুলোতে রোগের বিস্তার ও চিকিৎসা সেবার অভাব বাড়তে পারে।
সর্বোচ্চ সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে, গবেষণাটি অনুমান করে যে ২০৩০ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ২২.৬ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হতে পারে, যার মধ্যে ৫.৪ মিলিয়ন শিশু অন্তর্ভুক্ত। এই সংখ্যা বর্তমান প্রবণতার তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, যা স্বাস্থ্য সিস্টেমের দুর্বলতা ও আর্থিক ঘাটতির ফলাফল। বিশেষ করে পাঁচ বছরের নিচের শিশুরা এই ক্ষতির প্রধান শিকার হবে।
যদি সহায়তা মাঝারি মাত্রায় কমে, তবুও প্রায় ৯.৪ মিলিয়ন অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটতে পারে, যার মধ্যে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন শিশু থাকবে। যদিও সম্পূর্ণ হ্রাসের চেয়ে ক্ষতি কম, তবু এই পরিমাণ মানবিক ক্ষতি অগ্রাহ্য করা যায় না। গবেষকরা জোর দিয়ে বলেন, কোনো স্তরের সহায়তা হ্রাসই শিশুর স্বাস্থ্য ও জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলবে।
গবেষণা দলের প্রধান লেখক ডেভিডে রাসেলা উল্লেখ করেন, বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবেশে মাঝারি মাত্রার সহায়তা কমার সম্ভাবনা বেশি। তিনি সতর্ক করেন, যুক্তরাজ্যের রিফর্ম ইউকে‑এর মতো ডানপন্থী দলের নীতি বাস্তবায়িত হলে সহায়তা হ্রাসের হার তীব্রতর হতে পারে। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো স্বাস্থ্য সেক্টরের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করবে।
ইতিমধ্যে জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সুইডেনসহ বেশ কিছু প্রধান দাতা দেশ তাদের সহায়তা কমানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালের মধ্যে তার বিদেশি সহায়তার বাজেট ৬৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩২ বিলিয়ন ডলারে হ্রাস করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। যুক্তরাজ্য ২০২৮ সালের মধ্যে তার মোট জিডিপির ০.৫ শতাংশ থেকে ০.৩ শতাংশে সহায়তার অংশ কমানোর পরিকল্পনা করেছে।
এই আর্থিক কাটছাঁটের ফলে দাতা দেশের অভ্যন্তরে এবং উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্য সেবার মধ্যে ফাঁক বাড়বে বলে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন। বিশেষ করে, দাতাদের কমে যাওয়া তহবিল টিকাদান, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং অপুষ্টি মোকাবিলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অতএব, এই সেক্টরগুলোতে তহবিলের ঘাটতি সরাসরি শিশুমৃত্যুহার বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।
ঐতিহাসিকভাবে, বিদেশি সহায়তা পাঁচ বছরের নিচের শিশুমৃত্যুহার ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সহায়তা করেছে। এই সাফল্যের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল এইডস, ম্যালেরিয়া এবং অপুষ্টি‑সংশ্লিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক হস্তক্ষেপ। দাতা তহবিলের হ্রাস এই অগ্রগতিকে বিপন্ন করে, যা পুনরায় উচ্চ মৃত্যুহারকে উন্মুক্ত করতে পারে।
শিশু স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা বজায় রাখা জরুরি, কারণ এর অভাব দীর্ঘমেয়াদে মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়িয়ে তুলবে। নীতি নির্ধারকদের উচিত সহায়তার হ্রাসের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করে, বিকল্প তহবিল সংগ্রহের পথ অনুসন্ধান করা। সাধারণ জনগণও এই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন হয়ে, দাতা নীতির প্রতি সমর্থন ও পর্যবেক্ষণ বাড়াতে পারে।



