প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে গৃহীত দমন নীতি, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকালে কিছুটা শিথিল হলেও, রাজনৈতিক বিরোধী হিসেবে গণ্য হওয়া হাজারো নাগরিককে নির্বিচার গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং তাদের জামিন ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে, যা বুধবার জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে একনায়কতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গৃহীত অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং মানবাধিকার সংস্কার বাস্তবায়নে সংগ্রাম করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকালে, মে ২০২৩-এ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পর থেকে রাজনৈতিক গ্রেপ্তার বৃদ্ধি পেয়েছে। এরপর ১৭ নভেম্বর ২০২৪-এ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। এই রায়ের পর থেকে সরকারকে রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর উচ্ছৃঙ্খল সহিংসতা মোকাবেলায় বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন অংশে নারীর অধিকার ও এলজিবিটিবি সম্প্রদায়ের বিরোধী কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর কার্যক্রম বাড়ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত কমপক্ষে ১২৪ জনের মৃত্যু ঘটেছে, যা গণপিটুনির তীব্রতা নির্দেশ করে। এই গোষ্ঠীগুলোর উগ্রতা এবং মব ভায়োলেন্সের বৃদ্ধি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গৃহীত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেপ্তার নীতি অব্যাহত রেখেছে। অজ্ঞাতনামা অভিযোগের ভিত্তিতে শত শত ব্যক্তি, যার মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী ও সমর্থক অন্তর্ভুক্ত, হত্যার সন্দেহে আটক হয়েছে। এই ব্যক্তিদের অধিকাংশের জামিনের আবেদন নিয়মিতভাবে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে, যা বিচারহীন অবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে কারাবন্দী রাখার দিকে ইঙ্গিত করে।
গ্রেপ্তারকৃতদের তালিকায় অভিনেতা, আইনজীবী, গায়ক এবং রাজনৈতিক কর্মীও অন্তর্ভুক্ত। গত বছর থেকে চালু হওয়া ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে একটি অভিযান, বিশেষ করে রাজনৈতিক বিরোধী গোষ্ঠীর ওপর কেন্দ্রীভূত হয়ে, ব্যাপকভাবে গ্রেপ্তার বাড়িয়ে তুলেছে। এই অভিযানে অজানা সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বহু ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যদিও তাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রমাণের অভাব রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ফেব্রুয়ারি মাসে সাধারণ নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করেছে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে গ্রেপ্তার ও জামিন প্রত্যাখ্যানের ধারাবাহিকতা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতায় প্রশ্ন তুলছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সরকারকে মানবাধিকার সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পালন এবং বিচারিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষার দিক। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের দ্রুত মুক্তি এবং তাদের অধিকার রক্ষার জন্য আইনি প্রক্রিয়া দ্রুততর করা না হলে, দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়তে পারে। এই চ্যালেঞ্জের সমাধান না হলে, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সতর্কতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অশান্তি বাড়তে পারে।



