একটি সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে যে, কিছু গুঁড়ো পোকা (বিটল) তাদের লার্ভা দিয়ে মৌমাছির দৃষ্টি আকর্ষণ করে, ফুলের রঙ ও গন্ধ অনুকরণ করে। এই আচরণটি লার্ভাকে মৌমাছির গৃহে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি কৌশল হিসেবে কাজ করে, যেখানে তারা পোকা-শিশুরা পোষণকারী মধু ও পরাগের সুবিধা পায়।
গবেষণাটি ইউরোপের বিভিন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এলাকায় পরিচালিত হয় এবং লার্ভার আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। গবেষকরা লক্ষ্য করেন যে, লার্ভা ছোট, উজ্জ্বল রঙের গঠন গ্রহণ করে যা ফুলের পাপড়ির মতো দেখায়। পাশাপাশি, লার্ভা নির্দিষ্ট রাসায়নিক গন্ধ উৎপন্ন করে যা মৌমাছির জন্য আকর্ষণীয় ফুলের সুগন্ধের নকল।
মৌমাছি যখন এই নকল ফুলের দিকে উড়ে যায়, তখন লার্ভা দ্রুত তাদের পা বা পিঠে লেগে যায়। একবার লার্ভা মৌমাছির দেহে আটকে গেলে, মৌমাছি তা নিজের গৃহে নিয়ে যায়, যেখানে লার্ভা পোকা-শিশুরা পোষণকারী মধু ও পরাগের ভাণ্ডার থেকে খাবার পায়। এই পদ্ধতি লার্ভার বেঁচে থাকা ও বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা স্বয়ং নিজে খাবার সংগ্রহ করতে পারে না।
পর্যবেক্ষণকালে দেখা যায়, লার্ভা শুধুমাত্র দৃশ্যমান রঙের মাধ্যমে নয়, বরং গন্ধের মাধ্যমেও মৌমাছিকে আকৃষ্ট করে। লার্ভা যে গন্ধ উৎপন্ন করে তা মৌমাছির স্বাভাবিক ফুলের গন্ধের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, ফলে মৌমাছি তা স্বাভাবিক ফুল হিসেবে গ্রহণ করে। এই দ্বৈত নকল কৌশল লার্ভার সফলতা বাড়ায়।
গবেষকরা লার্ভার শারীরিক গঠনও বিশ্লেষণ করেন। লার্ভার পৃষ্ঠে সূক্ষ্ম চুলের মতো গঠন রয়েছে, যা ফুলের পাপড়ির টেক্সচারের নকল করে। এই গঠনটি মৌমাছির পা ও চোয়ালে সহজে লেগে থাকতে সাহায্য করে, ফলে লার্ভা দ্রুত সংযুক্ত হতে পারে। লার্ভা যখন মৌমাছির গৃহে পৌঁছায়, তখন তারা পোষণকারী মধু ও পরাগের সঞ্চয় থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে, যা তাদের পরবর্তী বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয়।
এই আবিষ্কারটি পোকা-প্রাণীর জটিল পারস্পরিক ক্রিয়া সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। পূর্বে জানা ছিল যে কিছু পোকা তাদের ডিম বা লার্ভা মৌমাছির গৃহে নিয়ে যায়, তবে এই গবেষণায় দেখা যায় যে লার্ভা নিজেই ফুলের নকল করে মৌমাছিকে আকৃষ্ট করে, যা একটি সক্রিয় কৌশল।
বৈজ্ঞানিক দল এই ফলাফলকে ইকোলজি ও বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে। লার্ভার এই নকল কৌশলটি সম্ভবত দীর্ঘ সময়ের বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার ফল, যেখানে পোকা-প্রাণী তাদের বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন হোস্টের সঙ্গে সমন্বয় করে।
গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে মৌমাছি সংরক্ষণ ও পোকা-প্রাণীর নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। যদি লার্ভার নকল কৌশলটি আরও বিশদে বোঝা যায়, তবে মৌমাছির গৃহে অনাকাঙ্ক্ষিত পোকা-শিশু প্রবেশ রোধের জন্য নতুন পদ্ধতি বিকাশ করা সম্ভব হতে পারে।
এই গবেষণার মাধ্যমে জানা যায় যে, প্রকৃতিতে অনেক জীব তাদের বেঁচে থাকার জন্য সূক্ষ্ম ও জটিল কৌশল ব্যবহার করে। লার্ভা যে ভাবে ফুলের নকল করে মৌমাছিকে আকৃষ্ট করে, তা প্রকৃতির সৃজনশীলতা ও অভিযোজনের একটি উদাহরণ।
পাঠকদের জন্য একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়: যদি আমরা মৌমাছির গৃহে প্রবেশ করা এই ধরনের লার্ভা থেকে রক্ষা পেতে পারি, তবে কীভাবে আমরা তাদের নকল কৌশলকে বুঝে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারি? এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎ গবেষণার দিকনির্দেশনা হতে পারে।



