তুর্কি রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইয়্যেপ এর্দোয়ান ৩ ফেব্রুয়ারি রিয়াদে অবতরণ করে, দুই বছরের বেশি সময়ের পর প্রথমবারের মতো সৌদি আরবের সরকারি সফর সম্পন্ন করেন। এফপিএইচ সূত্রে জানা যায়, বিশ্লেষকরা এই ভ্রমণকে রিয়াদ‑আঙ্কারা সম্পর্কের পুনরুজ্জীবনের সূচক হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
এর্দোয়ানের অফিসের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তুরস্ক ও গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) সদস্য দেশ সৌদি আরবের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিশদ আলোচনায় চূড়ান্ত সমঝোতা অর্জনের প্রত্যাশা রয়েছে। উভয় পক্ষ তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও পেট্রোকেমিক্যাল ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা নিশ্চিত করেছে এবং জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে চায়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সৌদি আরবের বৃহৎ জ্বালানি বিনিয়োগের সুবিধা নিয়ে বিদ্যুৎ ও টেকসই শক্তি ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহায়তা প্রদান করা হবে। এ ধরনের সহযোগিতা উভয় দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রাখে।
সৌদি আরব ও তুরস্কের সম্পর্ক ২০১১ সালের আরব গ্রীষ্মের পর থেকে নীতিগত পার্থক্যের কারণে তীব্রতায় পতন দেখেছিল। ২০১৮ সালে তুরস্কের মাটিতে প্রবাসী সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগি গুলি চালিয়ে নিহত হন, যা দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। তুর্কি কর্তৃপক্ষের মতে, এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত গুলিবিদ্ধদের নির্দেশনা সৌদি যুবরাজের কাছ থেকে এসেছে বলে অভিযোগ করা হয়।
সেই সময়ে দু’দেশের সম্পর্ক সর্বোচ্চ নিম্নগামী পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উভয় সরকার গাজার প্রতি সমর্থন এবং সিরিয়ার শাসক বাশার আল‑আসাদের উৎখাতের পরে নতুন সরকার গঠনে সমন্বিত অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে সম্পর্কের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
তুর্কি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু নিউজ জানায়, এর্দোয়ান রিয়াদ থেকে কায়রো দিকে রওনা হবেন, যা তার সফরের পরবর্তী ধাপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে, ৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
একজন আরব কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ইরান‑যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার সূচনা ইতিমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন। এ ধরনের উচ্চস্তরের বৈঠকের আগে এর্দোয়ানের সৌদি সফরকে কূটনৈতিকভাবে অর্থবহ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এর্দোয়ানকে উভয় পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক মতবিরোধ দূর করার জন্য সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা যেতে পারে। তার দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের জটিল গতি-প্রকৃতির প্রতি পরিচিতি এই ভূমিকা পালনে সহায়তা করবে।
সৌদি আরবের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রচেষ্টা তুরস্কের অর্থনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে প্রবেশের নতুন পথ খুলে দিতে পারে। তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতা উভয় দেশের শিল্পকে আধুনিকায়নের দিকে ধাবিত করবে।
অতীতের কূটনৈতিক সংকট সত্ত্বেও, দু’দেশের নেতৃত্বের সাম্প্রতিক সমন্বিত পদক্ষেপগুলো অঞ্চলীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক সংকেত প্রদান করছে। গাজার প্রতি সমর্থন এবং সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তনে সমন্বিত অবস্থান এই প্রবণতাকে শক্তিশালী করে।
এর্দোয়ানের রিয়াদ সফর এবং পরবর্তী কায়রো সফরকে তুরস্কের বহুমুখী কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সমস্যাগুলোর সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া হবে। এই সফর তুরস্কের আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বকে পুনরায় সজীব করার লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
সর্বশেষে, বিশ্লেষকরা এর্দোয়ানের ভূমিকা কূটনৈতিক সেতু গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র‑ইরান বৈঠকের আগে সৌদি আরবের সঙ্গে সমঝোতা চূড়ান্ত করা তুরস্কের কূটনৈতিক ক্যালেন্ডারকে সমৃদ্ধ করবে। ভবিষ্যতে এই ধরনের উচ্চস্তরের মিটিংগুলো অঞ্চলের রাজনৈতিক গতিপথে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।



