শিপিং মন্ত্রণালয়ের আন্তঃমন্ত্রিসভায় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) ড. এম. সাখাওয়াত হুসেইন আজ লাইটার জাহাজের পণ্য তিন দিনের মধ্যে আনলোড না করলে কঠোর শাস্তি দেওয়ার সতর্কতা জানিয়েছেন। তিনি লাইটার জাহাজের মাধ্যমে মূল জাহাজ থেকে পণ্য পরিবহন সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের জন্য এই নির্দেশনা প্রদান করেন।
উক্ত নির্দেশনা শিপিং মন্ত্রণালয়ের সভা কক্ষে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রিসভার সময় প্রকাশিত হয়। সভায় লাইটার জাহাজের অনিয়মিত কাজের ফলে সৃষ্ট বাজারের অস্থিরতা ও সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাতের বিষয়টি আলোচিত হয়।
ড. হুসেইন ডিপার্টমেন্ট অফ শিপিংয়ের ডিরেক্টর জেনারেলকে সকল আমদানিকর্তা ও পণ্য এজেন্টের তালিকা প্রস্তুত করতে আদেশ দেন, যারা লাইটার জাহাজ থেকে পণ্য সময়মতো আনলোড করতে ব্যর্থ। এই তালিকায় দেরি করা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নাম ও তাদের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হবে।
এরপর তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন, যাতে এই তালিকাটি মিডিয়াতে প্রকাশ করা হয় এবং দায়ী ব্যক্তিবর্গ বা সংস্থার লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রকাশ্য তালিকা বাজারে স্বচ্ছতা আনবে এবং অনিয়মিত কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিশ্চিত করবে।
রমজান মাসের আগমনের ফলে দেশীয় ভোক্তা পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই চাহিদা পূরণের জন্য জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আগত মূল জাহাজের সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ছিল। ফলে লাইটার জাহাজের ওপর চাপ বাড়ে এবং সময়মতো পণ্য হস্তান্তর কঠিন হয়ে পড়ে।
কিছু অনৈতিক ব্যবসায়ী লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করে, পণ্যের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করার চেষ্টা করছেন। এই প্রক্রিয়া লাইটার জাহাজের কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করে, যার ফলে মূল জাহাজের পণ্য আনলোডে বিলম্ব হয় এবং বাজারে সরবরাহের ঘাটতি দেখা দেয়।
শিপিং বিভাগের ত্রয়ী বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে লাইটার জাহাজের সমস্যার সমাধানে কাজ শুরু করেছে। এই টাস্কফোর্স নরায়ণগঞ্জ, যশোর, নোয়াপাড়া এবং দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিয়মিত অপারেশন চালাচ্ছে, যার মধ্যে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে লঙ্ঘনকারীকে তৎক্ষণাৎ শাস্তি দেওয়া হয়।
টাস্কফোর্সের কার্যক্রমের ফলে এখন পর্যন্ত বাইওয়াটিসি (বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন) মাধ্যমে ৭৩৫টি লাইটার জাহাজকে মূল জাহাজের বহিরঙ্গন নোঙরে সরবরাহ করা হয়েছে। এই সংখ্যা পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, যা পণ্য সরবরাহে ত্বরান্বিত ভূমিকা রাখছে।
লাইটার ভেসেল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার (অ্যাপ) ৩০ জানুয়ারি চালু করা হয়েছে, যা আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে লাইটার জাহাজের পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা আনবে। সফটওয়্যারের মাধ্যমে জাহাজের অবস্থান, আনলোডের সময়সূচি এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তির তথ্য রিয়েল-টাইমে আপডেট হবে।
এই প্রযুক্তি সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে লাইটার জাহাজের অপারেশন দক্ষতা বাড়বে, দেরি কমবে এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল হবে। বিশেষ করে রমজান মাসে ভোক্তা পণ্যের চাহিদা বাড়ার সময়ে এই ব্যবস্থা সরবরাহ শৃঙ্খলের ঝুঁকি হ্রাস করবে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, যদি লাইটার জাহাজের সময়মতো আনলোড নিশ্চিত করা যায়, তবে রমজান পূর্বে বাজারে মূল্যস্ফীতি কমে যাবে এবং ব্যবসায়িক চক্রে স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে। তবে সফটওয়্যারের সম্পূর্ণ গ্রহণ ও টাস্কফোর্সের কার্যকরী তত্ত্বাবধান না হলে আবার অনিয়মের ঝুঁকি রয়ে যাবে।
সারসংক্ষেপে, শিপিং উপদেষ্টা লাইটার জাহাজের সময়মতো পণ্য হস্তান্তরের জন্য কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে তালিকা প্রস্তুত ও প্রকাশের আদেশ দিয়েছেন এবং প্রযুক্তিগত সমাধান চালু করে বাজারের স্বচ্ছতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। এই পদক্ষেপগুলো রমজান মাসের পূর্বে ভোক্তা পণ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল করতে এবং অনিয়মী ব্যবসায়ীর কার্যকলাপ দমন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



