নাসা আর্থেমিস II মিশনের মাধ্যমে মার্চের প্রথম সপ্তাহে উৎক্ষেপণ করে চাঁদের চারপাশে একবার ঘুরে আসা চারজন মহাকাশচারীকে মহাকাশে পাঠাতে প্রস্তুত। এই যাত্রা ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো ১৭ মিশনের পর প্রথমবারের মতো মানবকে চাঁদের নিকটতম দূরত্বে নিয়ে যাবে।
প্রাথমিকভাবে ফেব্রুয়ারি ৬ তারিখে উৎক্ষেপণ পরিকল্পনা করা হলেও, ২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত “ওয়েট ড্রেস রিহার্সাল”-এ তরল হাইড্রোজেন ট্যাঙ্কে লিক পাওয়া যাওয়ায় নাসা লঞ্চকে মার্চে সরিয়ে দেয়। অতিরিক্ত পরীক্ষা ও আরেকটি ড্রেস রিহার্সাল সম্পন্ন করার জন্য সময় বাড়ানো হয়।
আর্থেমিস II মিশনের মূল লক্ষ্য চাঁদে অবতরণ নয়; এটি কেবল চন্দ্রের চারপাশে একবার ঘুরে ফিরে আসা। অবতরণ কাজটি ভবিষ্যৎ আর্থেমিস সিরিজের জন্য সংরক্ষিত, যেখানে ল্যান্ডার ও মানববসতি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই মিশনকে ১৯৬৮ সালের অ্যাপোলো ৮-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়, কারণ উভয়ই প্রথমবারের মতো মানবকে চাঁদের কক্ষপথে পাঠিয়েছে। অ্যাপোলো ৮ মূলত রাশিয়ার আগে চাঁদে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতার অংশ ছিল, আর আর্থেমিস II তেও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি প্রধান লক্ষ্য।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে আর্থেমিস II একটি বৃহৎ পরীক্ষা, যেখানে দীর্ঘমেয়াদী মহাকাশযাত্রা, জীবনের সমর্থন ব্যবস্থা এবং পুনঃপ্রবেশের সিস্টেমের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা হবে। এই পরীক্ষাগুলি ভবিষ্যৎ চন্দ্র অনুসন্ধান ও মঙ্গল গ্রহে মিশনের ভিত্তি গড়ে তুলবে।
বৈজ্ঞানিক দিকেও মিশনটি গুরুত্বপূর্ণ। মহাকাশচারীরা বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এবং কক্ষপথে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও ডেটা সংগ্রহের সুযোগ থাকবে। এছাড়া নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নতুন আর্কিটেকচার এবং মহাকাশযানের অভ্যন্তরীণ সরঞ্জামগুলোও বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য মূল্যবান তথ্য সরবরাহ করবে।
নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের গ্রহ বিজ্ঞানী মারি হেন্ডারসন উল্লেখ করেন, এই প্রজন্মের চন্দ্র বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো সরাসরি মিশনে অংশ নিতে পারছেন, যা পূর্বের তাত্ত্বিক গবেষণাকে বাস্তবে রূপ দেবে।
অ্যাপোলো সংগ্রহের কিউরেটর টিসেল মুইর-হারমনি বলেন, আর্থেমিস II-তে বিজ্ঞানীয় কাজের পাশাপাশি সিস্টেমের প্রস্তুতি প্রধান অগ্রাধিকার, যা ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
ফেব্রুয়ারি ২-এ অনুষ্ঠিত ভেজ ড্রেস রিহার্সালে তরল হাইড্রোজেন ট্যাঙ্কের লিক সনাক্ত হওয়ায় রকেটের জ্বালানি সিস্টেমে ত্রুটি প্রকাশ পায়। এই সমস্যার সমাধানের জন্য ট্যাঙ্কের সিলিং ও পাম্পের পুনরায় পরীক্ষা করা হয়।
লিক মেরামতের পর নাসা অতিরিক্ত টেস্টিং এবং আরেকটি ড্রেস রিহার্সাল পরিকল্পনা করেছে, যাতে উৎক্ষেপণের আগে সব সিস্টেমের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যায়। এই প্রক্রিয়ায় ইঞ্জিনের পারফরম্যান্স, ন্যাভিগেশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরায় যাচাই করা হবে।
আর্থেমিস সিরিজের পরবর্তী মিশনগুলো চাঁদে অবতরণ, মানববসতি গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদী বৈজ্ঞানিক গবেষণার দিকে মনোনিবেশ করবে। আর্থেমিস II সফল হলে ভবিষ্যৎ মিশনের জন্য প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি মজবুত হবে।
চাঁদের নিকটবর্তী এই মানববাহী যাত্রা বিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষের জন্য নতুন আশা জাগিয়ে তুলেছে। মানবজাতি কীভাবে মহাকাশে টিকে থাকতে পারে এবং চাঁদে স্থায়ী উপস্থিতি গড়ে তুলতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আর্থেমিস II গুরুত্বপূর্ণ এক ধাপ।
আপনার মতামত কী? আপনি কি মনে করেন আর্থেমিস মিশনগুলো মানবজাতির ভবিষ্যৎ মহাকাশ অনুসন্ধানে কতটা প্রভাব ফেলবে?



