রাজবাড়ীর পাংশা থানা অধীনে অবস্থিত বারোপল্লী শ্রী শ্রী মহাশ্মশান কালী মন্দিরে কালি, শিব, সাপ ও ডাকিনী-যোগিনীর মাটির তৈরি প্রতিমা ভাঙা পাওয়া গিয়েছে। ভাঙচুরের কাজটি রাত ২ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি রাত্রিকালে সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা মন্দিরের পূজারীর দ্বারা সন্ধ্যায় প্রথম নজরে আসে।
মন্দিরের প্রধান পূজারী মমতা বর্মন, যিনি ঐ সন্ধ্যায় মন্দিরে পূজা করার জন্য গিয়েছিলেন, ভাঙা প্রতিমাগুলোকে বিকৃত মুখের সঙ্গে দেখেন। তিনি অবিলম্বে মন্দির কমিটির নেতাদের এবং স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে জানিয়ে দেন। এরপর পাংশা মডেল থানার ওয়াকিং অফিসার শেখ মঈনুল ইসলাম ঘটনাস্থলে পৌঁছে, আশেপাশের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেন।
মন্দিরের কাঠামো পুরাতন পাকা মাটির ছাদযুক্ত, যেখানে প্রতিমাগুলো মাটির তৈরি। ভাঙা অবস্থায় দেখা যায় যে কালি, শিব, সাপ ও ডাকিনী-যোগিনীর মুখের অংশগুলো বিকৃত ও ভাঙ্গা। মন্দির কমিটির সূত্রে জানা যায়, ভাঙচুরের সময় কোনো সরঞ্জাম বা গ্লাসের চিহ্ন পাওয়া যায়নি, যা নির্দেশ করে যে কাজটি দ্রুত ও সরলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
পাংশা থানার ওসি শেখ মঈনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল পর্যন্ত কোনো সন্দেহভাজন সনাক্ত বা গ্রেফতার করা যায়নি। তিনি উল্লেখ করেন, তদন্তের জন্য স্থানীয় নিরাপত্তা ক্যামেরা রেকর্ড এবং সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, তবে এখনো পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট সূত্র পাওয়া যায়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রিফাতুল হক, যিনি নির্বাচনের পূর্বে ঘটনার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে মন্তব্য করেন, উল্লেখ করেন যে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন কিছু গোষ্ঠী ভয় সৃষ্টি করার জন্য এ ধরনের কাজ করতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সকল দায়িত্বশীলকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে সচেষ্ট থাকবে।
রাজবাড়ী পুলিশ সুপারমিনিস্টার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদও ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর বলেন, নির্বাচনের উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন অপরাধমূলক কাজের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। তিনি আশাবাদী যে, যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।
পাংশা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিধান কুমার বিশ্বাস, এই অঞ্চলটি ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সমন্বিতভাবে বসবাসকারী মানুষের ঘর বলে উল্লেখ করে, এ ধরনের কাজের মাধ্যমে কোনো স্বার্থপর গোষ্ঠী সমাজের ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি স্থানীয় সম্প্রদায়কে শান্ত থাকতে এবং আইনগত প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখতে আহ্বান জানান।
মন্দিরের পরিচালনা পরিষদ জানিয়েছে, ভাঙা প্রতিমাগুলো মেরামত বা পুনর্নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তবে প্রথমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে অতিরিক্ত নজরদারি নিশ্চিত করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা উল্লেখ করেন, মন্দিরটি হাটবনগ্রাম এলাকায় অবস্থিত এবং বহু বছর ধরে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে আসছে। ভাঙচুরের খবর শোনার পরই তারা মন্দিরের চারপাশে গিয়ে নিরাপত্তা বাড়াতে সাহায্য করেছে।
পুলিশের মতে, ভাঙচুরের সময় কোনো অগ্নিকাণ্ড বা ধ্বংসাত্মক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়নি, যা নির্দেশ করে যে কাজটি পরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্টভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তদন্তে স্থানীয় অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।
প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনাটি নির্বাচনী সময়কালে ঘটায়, যা নিরাপত্তা সংস্থার জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করার সংকেত দেয়। স্থানীয় প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা একত্রে কাজ করে, ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের আইনি শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
এই ঘটনার পর, পাংশা থানা এবং রাজবাড়ী জেলা পুলিশ উভয়ই স্থানীয় জনগণকে আশ্বস্ত করেছেন যে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ রোধে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে।



