ঢাকার পুরানা পল্টনের আইবিএম মিলনায়তনে বুধবার বিকালে জামায়াত-এ-ইসলামির আমির চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করিম ইসলামিক মুভমেন্ট বাংলাদেশকে সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগ তুলে ধরেন। একই অনুষ্ঠানে তিনি দলটির ৩০‑দফা ইশতেহার প্রকাশ করে ভোটারদের সামনে নতুন রাজনৈতিক এজেন্ডা উপস্থাপন করেন।
বক্তব্যের পূর্বে চরমোনাই পীর ইসলামিক আমেরিকার প্রতিনিধিদের সঙ্গে গোপন বৈঠকে এই অভিযোগ উত্থাপন করেছেন বলে জানানো হয়। বৈঠকের বিশদ প্রকাশ না করা সত্ত্বেও, উক্ত অভিযোগ ও ইশতেহার উন্মোচন একসাথে জনসমক্ষে জানানো হয়, যা রাজনৈতিক আলোচনায় তীব্রতা যোগ করেছে।
জামায়াত-এ-ইসলামি, যা ১৯৪১ সাল থেকে দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে সক্রিয়, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি ও ধর্মীয় নীতি সমর্থনকারী একটি দল হিসেবে পরিচিত। ইসলামিক মুভমেন্ট বাংলাদেশ, তুলনামূলকভাবে নতুন একটি সংগঠন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্মীয় ও সামাজিক ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। উভয় দলের মধ্যে এই ধরনের তীব্র সমালোচনা পূর্বে বিরল ছিল, ফলে আজকের ঘটনা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
ইশতেহারে শাসনে শারিয়াহকে সর্বোচ্চ শাসনব্যবস্থা হিসেবে স্থাপন, ধাপে ধাপে রাষ্ট্র সংস্কার, নতুন পিআর পদ্ধতি চালু, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ, সন্ত্রাসমুক্ত কল্যাণরাষ্ট্র গঠন, নারীর সমঅধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া ইত্যাদি মূল দফা অন্তর্ভুক্ত। শারিয়াহকে শাসনের ভিত্তি করে দেশের আইন ও নীতি পুনর্গঠন করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা দেশের সংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যের প্রশ্ন তুলতে পারে।
অধিকন্তু, রাষ্ট্র-সমাজ ও অর্থনীতিতে বৈষম্য দূর করা, দ্রব্যমূল্যের অতিবৃদ্ধি রোধে সিন্দিকেট ভাঙা, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা, এবং বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য সিন্দিকেট ভেঙে দামের নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে সব প্রাইভেট ও সরকারি প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা, যাতে শিক্ষার মান ও প্রবেশাধিকার সমান হয়, এই লক্ষ্যও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্নীতি মোকাবিলায় স্বচ্ছতা আইন প্রণয়ন, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের কঠোর শাস্তি, এবং সরকারি প্রক্রিয়ায় জনসাধারণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য নতুন পিআর পদ্ধতি চালু করার পরিকল্পনাও দলটি তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো সমর্থন না দিয়ে নিরাপত্তা শক্তিশালী করা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
নারীর সমঅধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অংশে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো, এবং সামাজিক নিরাপত্তা জালকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়েছে। এই দফাগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ নীতি ও আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে।
চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করিম জোর দিয়ে বলেন, ইসলামিক মুভমেন্ট বাংলাদেশ সরকার গঠন করলে উপরে উল্লেখিত সব দফা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। তিনি ইশতেহারের প্রতিটি পয়েন্টকে দেশের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন।
ইসলামিক মুভমেন্ট বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ ও ইশতেহার সংক্রান্ত কোনো মন্তব্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। তবে দলটির মুখপাত্রের মাধ্যমে ভবিষ্যতে স্পষ্টীকরণ আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা ইশতেহার প্রকাশ এবং জঙ্গি অভিযোগ উভয়ই দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করছেন, বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন সময়ে। বিরোধী দলগুলো মানবাধিকার ও সংবিধানিক নীতির লঙ্ঘন হিসেবে এই পদক্ষেপকে সমালোচনা করার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রাসঙ্গিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অভিযোগের বৈধতা যাচাই এবং ইশতেহার বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা প্রত্যাশিত। উভয় দলই তাদের নির্বাচনী কৌশল পুনর্বিবেচনা করে ভোটারদের কাছে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে পারে, যা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে তীব্র করবে।
এই ঘটনার পরবর্তী বিকাশ দেশের নিরাপত্তা, আইনি কাঠামো এবং রাজনৈতিক সমতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন।



