২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে মার্কিন সরকার বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে শুল্ক আরোপের নীতি চালু করায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তিনটি প্রধান রপ্তানি দেশ—মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ড—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখায়, তবে একই সময়ে চীনের সঙ্গে ঘাটতি বাড়িয়ে দেয়।
নিক্কেই এশিয়া প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনাম তাদের মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি যথাক্রমে ৪৫ শতাংশ, ৪৪ শতাংশ এবং ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির ফলে তিন দেশের মোট রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেয়ে তাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ১৭.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইলেকট্রনিক্স, বৈদ্যুতিক পণ্য, যন্ত্রপাতি, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং ইস্পাত পণ্যের চাহিদা শক্তিশালী হওয়ায় এই ফলাফল এসেছে। সরকারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি ২০২৫ সালে ২৩.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা দশ বছর আগে থেকে দশ গুণের বেশি।
ভিয়েতনাম ২০২৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি অর্জন করে, মোট ১৩৩.৮ বিলিয়ন ডলার রেকর্ড করেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইলেকট্রনিক্স ও যন্ত্রাংশ রপ্তানির ধারাবাহিক বৃদ্ধি এই ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
থাইল্যান্ডের মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি ২০২৫ সালে ৫১.৩ বিলিয়ন ডলারে বেড়েছে, যা ২০২৪ সালের ৩৫.৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ইলেকট্রনিক্স রপ্তানির সম্প্রসারণ এই বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি।
এপ্রিল মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে “পারস্পরিক শুল্ক” ঘোষণা করেন, যা বেশ কিছু এশীয় দেশের ওপর ৪০ শতাংশের বেশি শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা তৈরি করে। পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে শুল্কের হার কমিয়ে আগস্টে কার্যকর করা হয়।
শুল্ক আরোপের আগে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো শুল্কের প্রভাব কমাতে দ্রুত পণ্য রপ্তানি বাড়িয়ে দেয়। এই সময়ে রপ্তানি পরিমাণে তীব্র বৃদ্ধি দেখা যায়, যা শুল্কের সম্ভাব্য ক্ষতি সীমিত করতে সহায়তা করে।
অক্টোবর মাসে মার্কিন সরকার মালয়েশিয়া থেকে অধিকাংশ পণ্যের শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করে। এছাড়া সেমিকন্ডাক্টর, এয়ারোস্পেস এবং ফার্মাসিউটিক্যাল সহ ১,৭১১টি পণ্যের ওপর শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়।
মালয়েশিয়া এই শুল্ক হ্রাসের বিনিময়ে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বা কোটা আরোপ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই চুক্তি দু’পক্ষের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করে এবং ভবিষ্যতে শুল্ক বিরোধের ঝুঁকি কমায়।
মার্কিন শুল্ক নীতির ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রপ্তানি কাঠামোতে সাময়িক পরিবর্তন দেখা গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে এই দেশগুলো মার্কিন বাজারে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স ও উচ্চ প্রযুক্তি পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি এই প্রবণতাকে সমর্থন করে।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার কারণ হল একই সময়ে চীনের থেকে রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে, যদিও শুল্ক নীতি সরাসরি চীনের ওপর প্রয়োগ করা হয়নি। এশিয়ার উৎপাদন শৃঙ্খলে চীনের ভূমিকা কমে যাওয়ায় এই ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করেন, ভবিষ্যতে মার্কিন শুল্ক নীতি পুনর্বিবেচনা হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রপ্তানি প্রবণতা পুনরায় পরিবর্তিত হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মার্কিন বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির গতি বজায় রাখার সম্ভাবনা বেশি।
এই বাণিজ্যিক পরিবর্তনগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক নীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, বিশেষ করে রপ্তানি-নির্ভর শিল্পের জন্য নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং শুল্ক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশল গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বাড়াবে।



