ফরিদপুরের সদরপুর, চরভদ্রাসন ও ভাঙ্গা উপজেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা ফরিদপুর-৪ আসনে এখন তিনপাশের প্রার্থী একে অপরের সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালাচ্ছেন। ঐতিহ্যগতভাবে কাজী জাফর উল্যা (আওয়ামী লীগ) ও যুবলীগের মুজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরীর নেতৃত্বে এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রভাবের অধীনে ছিল। নিক্সন চৌধুরী ২০০২ সালের উপনির্বাচনসহ তিনবার জয়লাভের পর থেকে এই অঞ্চলে তার রাজনৈতিক উপস্থিতি দৃঢ় করে রেখেছেন, যদিও ২০০২ সালের উপনির্বাচনে একবার বিএনপির প্রার্থী জয়ী হয়েছিল।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঘটিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে এই আসনের ভোটের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। আওয়ামী লীগের প্রভাবহীন নির্বাচনী মঞ্চে বিএনপি এখন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অবস্থান করে, আর পূর্বে পার্টি-ভিত্তিক সমর্থন হারিয়ে যাওয়া দলগুলো নতুন জোটের সন্ধান করছে। জামায়াত-এ-ইসলামি নেতৃত্বাধীন একাদশ দলীয় জোট এই আসনে কোনো একক প্রার্থী নির্ধারণ না করে উন্মুক্ত অবস্থায় রেখেছে, ফলে জামায়াত-এ-ইসলামি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস উভয়েরই প্রার্থী তালিকায় স্থান পেয়েছে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী এ এ এম মুজাহিদ বেগ, যিনি ফুটবলে তার প্রতীক দিয়ে পরিচিত, স্থানীয় স্তরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। তার সমর্থকগণ তাকে নিয়ে আশাবাদী এবং তার প্রচারণা মূলত সামাজিক ও সেবামূলক কাজের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে, বিএনপির প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বাবুল (ধানের শীষ) তার পারিবারিক ভিত্তি এবং পূর্ববর্তী নির্বাচনী অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. মিজানুর রহমান মোল্যা (রিকশা) এবং জামায়াত-এ-ইসলামির মো. সরোয়ার হোসেনও নিজেদের প্রচারণা চালিয়ে আসনের ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করছেন। এছাড়া, জাতীয় পার্টির রায়হান জামিল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. ইসহাক চোকদার, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির আতাউর রহমান এবং ঘোড়া প্রতীকধারী স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ মজিবুর হুসাইনও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিচ্ছেন।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলার সময় দেখা যায়, জামায়াত-এ-ইসলামি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যে কোনো এক দল যদি জোট থেকে সরে যায়, তবে বাকি দলটি একা গিয়ে জোটের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। তবে, বর্তমানে উভয় দলই একসাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালিয়ে যাচ্ছে, ফলে আসনের ফলাফল অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, কিছু সূত্রে বলা হচ্ছে যে আওয়ামী লীগের কিছু স্থানীয় নেতা ও কর্মী এখন বিএনপির প্রার্থীর প্রচারে অংশগ্রহণ করছেন। যদিও এই তথ্যের স্বতন্ত্র যাচাই করা যায়নি, তবে স্থানীয় পর্যায়ে এমন প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
শহিদুল ইসলাম বাবুলের মূল বাসস্থান ফরিদপুর-২ আসনের নগরকান্দা উপজেলায়, তবে তিনি বর্তমানে সদরপুরে ক্যাম্পেইন চালিয়ে যাচ্ছেন। তার নামের সঙ্গে যুক্ত একটি কৌশলগত পরিবর্তন দেখা গেছে; প্রার্থীটি আওয়ামী লীগের শক্ত ভিত্তি থাকা এলাকায় তার প্রচারকে পুনর্গঠন করে, ফলে স্থানীয় দলনেতা ও কর্মীদের সমর্থন পেয়েছেন। এই পরিবর্তন তাকে ভোটারদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রাখছে।
সদরপুরের ব্যবসায়ী সাব্বির হোসেনের মতে, পূর্বে নির্বাচিত সংসদ সদস্য নিক্সন চৌধুরীর প্রভাব এখনও কিছু স্তরে বজায় আছে, তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন প্রার্থীদের উত্থান স্পষ্ট। তিনি উল্লেখ করেন যে, ভোটাররা এখন পার্টি লেবেল ছাড়াই ব্যক্তিগত সুনাম ও কাজের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে বেশি আগ্রহী।
প্রতিটি দলের প্রচারণা মূলত গ্রামীন মিটিং, দরজায় দরজা সফর এবং সামাজিক সেবার মাধ্যমে চালানো হচ্ছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর ফুটবল প্রতীক এবং ঘোড়া প্রতীকধারী প্রার্থীর প্রচারণা বিশেষভাবে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করছে। একই সঙ্গে, জোটের প্রার্থী ও প্রধান দলগুলোর প্রচারাভিযানেও স্থানীয় সমস্যার সমাধান, কৃষি উন্নয়ন ও অবকাঠামো প্রকল্পের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি জামায়াত-এ-ইসলামি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়, তবে জোটের ভোটের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। অন্যদিকে, বিএনপি যদি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে কোনো সমন্বয় না করে, তবে তার জয় সম্ভাবনা সীমিত থাকতে পারে।
আসনের ফলাফল দেশের সংসদীয় গঠনকে প্রভাবিত করবে, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক গতিপথে নতুন দিকনির্দেশনা যোগ করবে। ভোটের শেষ দিন পর্যন্ত প্রার্থীদের প্রচারণা তীব্র থাকবে, এবং ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে পার্টি গঠন ও জোটের পুনর্গঠন সম্ভব হবে।
এই প্রেক্ষাপটে, ফরিদপুর-৪ আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক দৃশ্যের একটি মাইক্রো-কোড হিসেবে কাজ করবে, যেখানে স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা, জোটের কৌশল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর উদ্ভব একসঙ্গে ভোটারদের চূড়ান্ত পছন্দকে গঠন করবে।



