জাতিসংঘের নিউইয়র্ক সদর দপ্তরে ৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ইউএনডিপি নির্বাহী পর্ষদের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশ সরকারের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী দেশকে বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাজ করার নতুন প্রতিশ্রুতি পুনরায় জানালেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ সরকার স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নত দেশের পথে অগ্রসর হওয়ার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও পূর্বানুমেয় সহায়তা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এই বক্তব্যের পটভূমিতে দেশের সাম্প্রতিক এলডিসি থেকে উত্তরণ পরিকল্পনা, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জাতীয় লক্ষ্য এবং চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া রয়েছে।
সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী ইউএনডিপি’র গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ জোরদার করা এবং বিচারিক সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার ওপর আলোকপাত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইউএনডিপি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া, নাগরিক সমাজের ক্ষমতায়ন এবং স্বচ্ছ বিচার ব্যবস্থার গঠনে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করেছে। এই সহায়তা দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কারকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখে।
রাষ্ট্রদূত জানান, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ধারাবাহিকতা ও পূর্বানুমেয়তা নিশ্চিত করতে চায়, যাতে দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে। তিনি জোর দেন যে, ইউএনডিপি’র ম্যান্ডেট ও দেশভিত্তিক কর্মসূচি দেশের নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী সাজানো হলে তা সর্বোচ্চ ফলপ্রসূ হবে। এ জন্য উভয় পক্ষের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়, তথ্য শেয়ারিং এবং যৌথ পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া অপরিহার্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের চলমান সংস্কার উদ্যোগের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে, বিশেষত নিরাপদ ও স্বচ্ছ গবর্নেন্সের জন্য প্রস্তাবিত কাঠামোগত পরিবর্তনগুলোকে স্বাগত জানায়। তিনি যুক্তি দেন যে, এই সংস্কারগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধি করবে এবং উন্নয়ন সহায়তার গুণগত মান উন্নত করবে। একই সঙ্গে, ইউএনডিপি’র বাস্তবায়ন ম্যান্ডেটের পুনঃপর্যালোচনা এবং দেশভিত্তিক কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা পুনরায় জোর দিয়ে বলেন যে, এই দুইটি উপাদান একসঙ্গে কাজ করলে উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে গতি পাবে।
সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী ইউএনডিপি’র নতুন প্রশাসক আলেকজান্ডার ডে ক্রোকে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে, তার নেতৃত্বে উভয় সংস্থার সহযোগিতা আরও দৃঢ় হবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, বাংলাদেশ সরকার নতুন প্রশাসকের দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলকে স্বাগত জানাবে এবং সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গঠনে পূর্ণ সমর্থন দেবে। এই সমর্থনকে তিনি দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন কৌশল ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেন।
উল্লেখযোগ্য যে, ইউএনডিপি এবং বাংলাদেশ সরকারের এই পুনর্ব্যক্ত অংশীদারিত্বের ভিত্তি ২০১০ সালের পর থেকে গড়ে ওঠা বহু প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল, যার মধ্যে গ্রামীণ অবকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং ডিজিটাল রূপান্তর অন্তর্ভুক্ত। এসব প্রকল্পের অগ্রগতি ও ফলাফল নিয়মিতভাবে উভয় পক্ষের সমন্বয় কমিটিতে পর্যালোচনা করা হয়। এই প্রক্রিয়া দেশের উন্নয়ন সূচকে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে, এই পুনরায় নিশ্চিতকৃত সহযোগিতা বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এনে দেবে, যা দেশের মানব উন্নয়ন সূচককে ত্বরান্বিত করবে। একই সঙ্গে, ইউএনডিপি’র সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় সরকারকে নীতি নির্ধারণে আন্তর্জাতিক সেরা চর্চা গ্রহণে সহায়তা করবে, বিশেষত বিচারিক সংস্কার ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে। ফলে, ভবিষ্যতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে বিশ্বাস ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনডিপি’র এই পুনর্ব্যক্ত অংশীদারিত্ব কেবল বর্তমান উন্নয়ন প্রকল্পের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে না, বরং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার জন্য নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। উভয় পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা দেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে।



