পানামার সর্বোচ্চ আদালত গত সপ্তাহে চীনভিত্তিক সিকে হাচিসন ও তার সহযোগী পানামা পোর্টস কোম্পানির মধ্যে থাকা দুই কৌশলগত বন্দরের পরিচালনা চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এই পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্রের চাপের প্রেক্ষাপটে নেওয়া হয়েছে এবং ফলে চীন ও পানামার মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা তীব্রতর হয়েছে।
সিকে হাচিসন, হংকং ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান, চুক্তি বাতিলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া চালু করার ঘোষণা দেয়। কোম্পানি উল্লেখ করেছে যে, পানামার রায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নীতিমালার লঙ্ঘন এবং চীনের বৈধ স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
চীনের হংকং ও ম্যাকাও বিষয়ক দফতরও পানামার রায়ের কঠোর সমালোচনা করে। তারা রায়কে অযৌক্তিক, লজ্জাজনক এবং করুণ বলে উল্লেখ করে এবং পানামার সিদ্ধান্তকে তথ্য উপেক্ষা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত করে।
দফতর আরও জোর দিয়ে বলেছে যে, চীন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থার ন্যায্যতা রক্ষায় যথেষ্ট সক্ষমতা ও উপায় রাখে। তারা সতর্ক করে যে, পানামা যদি রায় কার্যকর করে, তবে তাকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রে বড় মূল্য দিতে হবে।
পানামা সরকার চুক্তি বাতিলের পর আন্তর্জাতিক সালিশ প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পদক্ষেপটি দেশের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগের ওপর প্রভাব কমাতে নেওয়া হয়েছে বলে ব্যাখ্যা করা হয়।
বিশ্লেষকরা যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের পেছনে কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে, কারণ পানামা খাল বিশ্ব বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমাতে চীনের বিনিয়োগকে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা এই সিদ্ধান্তের পেছনে থাকতে পারে।
পানামা খালের দুইটি প্রধান বন্দর, যা সিকে হাচিসনের পরিচালনায় ছিল, কন্টেইনার শিপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাব। এই বন্দরগুলোতে চুক্তি বাতিলের ফলে শিপিং কোম্পানিগুলোকে বিকল্প রুট বা টার্মিনাল বিবেচনা করতে হতে পারে।
পানামা খাল বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৫ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কন্টেইনার ট্রাফিকের ৪০ শতাংশ পরিচালনা করে। চুক্তি বাতিলের ফলে খালের ব্যবহারিক দক্ষতা ও আয়ে সাময়িক হ্রাসের সম্ভাবনা দেখা দেয়, যা পানামার রাজস্বে প্রভাব ফেলতে পারে।
পানামার অর্থনীতিতে খালের আয় একটি প্রধান উৎস, তাই কোনো ব্যাঘাত সরাসরি দেশের বাজেট ও বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করবে। চীনের সঙ্গে চলমান বিরোধের ফলে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগের প্রবাহে হ্রাসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
চীনের জন্যও এই ঘটনা কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। সিকে হাচিসনের মতো চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক অবকাঠামো প্রকল্পে বড় অংশীদার, এবং তাদের অধিকার রক্ষার জন্য আইনি লড়াইকে দীর্ঘমেয়াদী কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে পানামা খালের পরিচালনা ও বিনিয়োগের পরিবেশে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পেতে পারে। শিপিং শিল্পের জন্য রুটের স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ, তাই কোনো রাজনৈতিক বা আইনি অস্থিরতা শিপিং ফি ও বীমা প্রিমিয়ামে প্রভাব ফেলতে পারে। উভয় দেশই এই ঝুঁকি কমাতে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা অনুসন্ধান করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, পানামা সুপ্রিম কোর্টের চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত চীন-পানামা বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন মোড়ে নিয়ে এসেছে এবং আন্তর্জাতিক শিপিং বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। উভয় পক্ষের আইনি পদক্ষেপ ও কূটনৈতিক আলোচনার ফলাফলই ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক প্রবাহের দিক নির্ধারণ করবে।



