গঙ্গা‑বর্ষা‑যমুনা (GBM) বেসিনের পানির ভাগাভাগি চুক্তি ২০২৬ সালের শেষের দিকে সমাপ্ত হবে, যা বাংলাদেশ সরকারের জন্য জলসম্পদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই চুক্তি ভারতের সঙ্গে গঙ্গা নদীর শুষ্ক মাসে পানির ভাগ নির্ধারণ করে, এবং মেয়াদ শেষের পর নতুন কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি না থাকলে প্রবাহের ওপর অনিশ্চয়তা বাড়বে।
প্রাক‑স্বাধীনতা সময়ের একটি জনপ্রিয় স্লোগান “তোমার আমার ঠিকানা – পদ্মা‑মেঘনা‑যমুনা” দেশের অস্তিত্বে নদীর অপরিহার্য ভূমিকা তুলে ধরেছে। ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশের ভূমি প্রধানত নদী‑বহনকারী সেডিমেন্টের সঞ্চয়ে গড়ে উঠেছে, আর দেশের অধিকাংশ প্রধান নদীই সীমান্ত পারাপারকারী, যা দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকে সীমিত করে।
GBM বেসিনের মোট ক্ষেত্রফলের মাত্র ৮% বাংলাদেশে অবস্থিত, তবু এই বেসিনের মোট ৬ কোটি জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ বাংলাদেশে বাস করে। বেসিনে মোট ৫৪টি সীমান্ত‑পারের নদী রয়েছে, যার মধ্যে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা‑মেঘনা ইত্যাদি প্রধান। এই নদীগুলোর প্রবাহের ওপর সীমিত নিয়ন্ত্রণের ফলে দেশের কৃষি, শিল্প, মৎস্য ও পানীয় জলের সরবরাহে সরাসরি প্রভাব পড়ে।
বর্তমানে গঙ্গা নদীর পানির ভাগাভাগি নিয়ে ভারত‑বাংলাদেশের মধ্যে ৩০ বছরের একমাত্র চুক্তি রয়েছে, যা ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। যদিও গঙ্গা বেসিনে নেপালও অন্তর্ভুক্ত, তবু এই চুক্তি কেবল দুই দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে, ফলে নেপালের সঙ্গে কোনো সরাসরি সমঝোতা নেই।
চুক্তির মেয়াদ শেষের সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গা‑বর্ষা‑যমুনা বেসিনের পানির বণ্টন নিয়ে নতুন আলোচনার প্রয়োজনীয়তা তীব্র হবে। বাংলাদেশ সরকার এই সময়ে পুনরায় দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে, যাতে বেসিনের সমগ্র দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ রক্ষা করা যায়।
ইন্ডিয়া‑নেপালের মধ্যে গন্ধক ও কোসি নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে আলাদা চুক্তি রয়েছে, যা গঙ্গা বেসিনের উপনদী হিসেবে কাজ করে। তবে এই চুক্তিগুলোও সীমিত সময়ের এবং নির্দিষ্ট নদীর ওপর কেন্দ্রীভূত, ফলে সমগ্র বেসিনের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে না।
আন্তর্জাতিক আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে, সীমান্ত‑পারের নদীকে একক বেসিন হিসেবে বিবেচনা করে সমন্বিত জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা (Integrated Water Resources Management) গ্রহণের নীতি প্রাধান্য পায়। ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের “অ-নৌচালিত আন্তর্জাতিক জলধারার ব্যবহার সংক্রান্ত কনভেনশন” এই নীতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, যেখানে ন্যায্যতা, যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার ও পরিবেশ সংরক্ষণের নীতি উল্লেখিত।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, GBM বেসিনের সমগ্র দেশীয় অংশীদারদের মধ্যে সমন্বিত নীতি গ্রহণ না করা হলে বন্যা, শুষ্কতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়বে। তাই বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, তথ্য শেয়ারিং ও যৌথ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছে।
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন হিসেবে ২০২৬ সালের শেষের আগে নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়া প্রত্যাশিত। এই আলোচনায় ভারত, নেপাল এবং সম্ভবত চীনকে অন্তর্ভুক্ত করে বহুপাক্ষিক ফ্রেমওয়ার্ক গঠন করা যেতে পারে, যা বেসিনের সমগ্র হাইড্রোলজিকাল চক্রকে বিবেচনা করবে। এছাড়া, জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রযুক্তিগত সহায়তা ও মধ্যস্থতা চুক্তির সফলতা বাড়াতে পারে।
সারসংক্ষেপে, গঙ্গা‑বর্ষা‑যমুনা বেসিনের পানির ভাগাভাগি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া বাংলাদেশ সরকারের জন্য কেবল একটি আইনি সময়সীমা নয়, বরং দেশের জলসম্পদ নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন ও জনস্বাস্থ্যের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের সূচক। তাই সমন্বিত, ন্যায্য ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে বহুপাক্ষিক আলোচনার ত্বরান্বিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গঠন করা জরুরি।



