মাসের পর মাসের গণঅভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্ট ২০২৪-এ গঠিত অস্থায়ী সরকার, দেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করে। তবে, এই সরকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় জনসাধারণের আস্থা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।
অস্থায়ী সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশের আর্থিক অবস্থা স্থিতিশীল করা এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া, কিন্তু বাজারে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি, বিনিয়োগের হ্রাস এবং বেকারত্বের হার বাড়ার ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। সরকারী নীতি ও পরিকল্পনা প্রয়োগে ধারাবাহিকতা না থাকায় ব্যবসায়িক পরিবেশ অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গৃহীত পদক্ষেপগুলোও প্রত্যাশিত ফল না দিয়ে শেষ হয়েছে। অপরাধের হার বৃদ্ধি, প্রতিবাদে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার বিলম্বের ফলে নাগরিকদের নিরাপত্তা অনুভূতি হ্রাস পেয়েছে। এই পরিস্থিতি অস্থায়ী সরকারের ক্ষমতা ও দায়িত্বের প্রতি প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত উপদেষ্টা মণ্ডলীর নিয়োগের পরেও কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়নি। তাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান সত্ত্বেও নীতি বাস্তবায়নের কাঠামো দুর্বল হওয়ায় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়েছে। ফলে, সরকারকে কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, শাসনব্যবস্থার সামগ্রিক সংস্কার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা উচ্চস্বরে অগ্রগতির কথা বললেও বাস্তবতা ভিন্ন রকমের। সরকারী ঘোষণায় অগ্রগতি জোর দিয়ে বলা হলেও, বাস্তবিকভাবে আইনগত কাঠামোর স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা হ্রাস পেয়েছে। এই দ্বন্দ্ব জনমতকে বিভ্রান্ত করে এবং শাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয় করে।
বিচারিক স্বায়ত্তশাসনের অবনতি এবং আইনের শাসনের দুর্বলতা দেশের দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধি ও গণতন্ত্রের ভিত্তি ক্ষয় করছে। যখন বিচারিক সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের শিকার হয়, তখন ন্যায়বিচারকে জনসাধারণের কাছে অপ্রাপ্য করে তোলা হয়। এই অবস্থা দেশের আইনি সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
আসন্ন সরকার, তা কোন দলই হোক না কেন, এই সমস্যাকে পার্শ্বিক বিষয় হিসেবে নয়, মূল অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। শাসনের মৌলিক নীতি পুনর্গঠন না করা পর্যন্ত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা কঠিন হবে। তাই, আইনের শাসন ও বিচারিক স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারকে কেন্দ্রীয় নীতি হিসেবে গৃহীত করা জরুরি।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশকে দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসের মডেল হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছে। তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ইতিবাচক চিত্রটি ধীরে ধীরে দুর্বলতায় পরিণত হচ্ছে। অর্থনৈতিক সূচকগুলো উন্নতি দেখালেও, শাসনব্যবস্থার অবক্ষয় তা ছাপিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানিক দুর্বলতার স্পষ্ট লক্ষণগুলো হল নির্বাহী ও বিচারিক শাখার মধ্যে সীমানার ম্লানতা, রাজনৈতিক স্বার্থে আইনগত প্রক্রিয়ার ব্যবহার, বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘায়ু এবং ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের জন্য আইনের প্রয়োগে অবহেলা। এসব উপাদান একত্রে একটি সংস্কৃতির জন্ম দিচ্ছে যেখানে আইনকে কেবল পরামর্শ হিসেবে দেখা হয়, বাধ্যতামূলক নীতি নয়।
সারসংক্ষেপে, অস্থায়ী সরকারের সময়কালে অর্থনৈতিক ও আইনগত অস্থিতিশীলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ শাসনের জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা বহন করে। শাসনের মূলভিত্তি পুনর্গঠন না করা পর্যন্ত গণতন্ত্রের সাফল্য ও দেশের উন্নয়ন স্থায়ী হবে না।



