গত রাত ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে বাংলাদেশে দুইটি ধারাবাহিক ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। প্রথম কম্পনের তীব্রতা রিখটার স্কেলে ৫.৯ রেকর্ড হয়েছে এবং তৎক্ষণাৎ আফটারশকের আশঙ্কা উত্থাপিত হয়েছে। কোনো উল্লেখযোগ্য ক্ষতি বা আঘাতের রিপোর্ট না থাকলেও, জনগণকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ, তার যাচাইকৃত ফেসবুক পেজে জানিয়েছেন যে ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী প্রথম ভূকম্পনের কেন্দ্রভূমি প্রায় ৬৩ কিলোমিটার গভীরতায় ঘটেছে। রিখটার স্কেল ৫.৯ মানে মধ্যম তীব্রতার কম্পন, যা মাটিতে স্পষ্ট শেকিং সৃষ্টি করে কিন্তু সাধারণত বড় ধ্বংসাবশেষের কারণ হয় না। ইউএসজিএস ভূ‑আফটারশক সম্ভাবনা মূল্যায়নে এই ধরনের তথ্য ব্যবহার করে।
পলাশ উল্লেখ করেন যে এই কম্পনটি একই ফল্টে সংঘটিত হয়েছে, যেখানে ২০২৪ সালে ৭.৫ মাত্রার একটি বিশাল ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়েছিল। ফল্টটি ভূ‑তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় হিসেবে বিবেচিত, ফলে ধারাবাহিক কম্পনের সম্ভাবনা স্বাভাবিক। সক্রিয় ফল্টের ওপর ছোট‑মাঝারি কম্পন ঘন ঘন ঘটতে পারে, যা পরবর্তী আফটারশকের সূচক হতে পারে।
বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ৪০ মিনিটে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্শ্ববর্তী বেশ কয়েকটি জেলা ভূকম্পন অনুভব করেছে। কম্পনের তীব্রতা বেশিরভাগ স্থানে ‘মৃদু’ থেকে ‘মাঝারি’ স্তরে সীমাবদ্ধ ছিল, ফলে কোনো গৃহস্থালী ধ্বংস বা সড়ক ক্ষতি রিপোর্ট করা হয়নি। কক্সবাজারের দক্ষিণ‑পূর্বে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি উৎপত্তিস্থল থাকা এই কম্পন, ভূ‑তাত্ত্বিকভাবে এই অঞ্চলে তীব্র শেকিং সৃষ্টি করে।
প্রায় ২০ মিনিট পরই মিয়ানমারে আরেকটি কম্পন ধরা পড়ে। মেডিটেরেনিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (ইএমএসসি) অনুযায়ী এই দ্বিতীয় ভূকম্পনের রিখটার স্কেল ৫.৩ এবং গভীরতা প্রায় ৫০ কিলোমিটার। ইএমএসসি রাত ৯টা ৫১ মিনিটে এই কম্পন রেকর্ড করেছে, যা প্রথম কম্পনের ঠিক পরেই ঘটেছে এবং একই ফল্টের ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।
ইএমএসসির তথ্য অনুযায়ী দ্বিতীয় কম্পনের ভৌগোলিক সমন্বয় ২০.৫১০° উত্তর অক্ষাংশ ও ৯৩.৯৩২° পূর্ব দ্রাঘিমাংশে নির্ধারিত হয়েছে। এই অবস্থান রাখাইন রাজ্যের সিত্তে শহর থেকে প্রায় ১১৫ কিলোমিটার পূর্ব‑উত্তর‑পূর্বে এবং ইয়েনানগিয়াং শহর থেকে প্রায় ৯৮ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। উভয় সমন্বয়ই পূর্বের বড় ভূকম্পনের উৎপত্তিস্থলের নিকটবর্তী, যা ফল্টের ধারাবাহিক সক্রিয়তা নিশ্চিত করে।
দুপুরের আগে, ভোরে একটি ছোট ভূকম্পনও রেকর্ড করা হয়। রিখটার স্কেলে এই কম্পনের মাত্রা ৪.১, যা ‘মৃদু’ শ্রেণির এবং সাধারণত মানুষের দৈনন্দিন কার্যকলাপে বড় প্রভাব ফেলে না। কেন্দ্রস্থল ঢাকা থেকে ১৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ‑পশ্চিমে, সাতক্ষীরার কলারোয়া এলাকায় নির্ধারিত হয়েছে; সমন্বয় ২২.৮৪° উত্তর অক্ষাংশ ও ৮৯.০১° পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। এই কম্পনেও কোনো উল্লেখযোগ্য ক্ষতি রিপোর্ট করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন যে সক্রিয় ফল্টের ওপর ধারাবাহিক কম্পন ঘটলে অতিরিক্ত ছোট‑মাঝারি ভূকম্পন দেখা দিতে পারে। তাই স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সতর্কতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জনগণকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া, দরজা-জানালা বন্ধ রাখা এবং জরুরি কিট প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তীব্র কম্পন না হলেও, আফটারশকের সম্ভাবনা থাকায় সজাগ থাকা জরুরি।
বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলো রিয়েল‑টাইমে ডেটা সংগ্রহ করে এবং সম্ভাব্য আফটারশকের পূর্বাভাস দেয়। বর্তমান পর্যায়ে কোনো বড় আকারের আফটারশক রেকর্ড করা হয়নি, তবে ভূ‑তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা থেকে এক-দু’দিনের মধ্যে অতিরিক্ত কম্পন হতে পারে। তাই সরকারী ও বেসরকারি সংস্থার নির্দেশনা মেনে চলা, জরুরি যোগাযোগের তালিকা আপডেট রাখা এবং পরিবারিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
আপনার এলাকায় যদি কোনো অস্বাভাবিক শেকিং অনুভব করেন, তবে তা সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় জরুরি সেবা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। এই ধরনের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করে বিজ্ঞানীরা আফটারশক পূর্বাভাসের নির্ভুলতা বাড়াতে পারেন। আপনি কি আপনার বাড়ি ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করেছেন?



