বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় জানিয়েছে যে ২০২২ সালে সনাক্ত হওয়া ১৮.৭ মিলিয়ন ক্যান্সার কেসের মধ্যে প্রায় ৭.১ মিলিয়নটি এমন ঝুঁকি থেকে উদ্ভূত যা পরিবর্তনযোগ্য। এই ফলাফল নির্দেশ করে যে মোট কেসের প্রায় ৩৭.৮% প্রতিরোধের আওতায় রয়েছে।
গবেষণাটি ৩৬টি ক্যান্সার প্রকার এবং ১৮৫টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে এবং ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে মেডিকেল জার্নাল Nature Medicine-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা (IARC)-এর ক্যান্সার পর্যবেক্ষণ বিশেষজ্ঞ ইসাবেল সোরজোমাটারাম এবং তার সহকর্মী আন্দ্রে ইলবাওই।
প্রধান ফলাফল অনুযায়ী, টোবাকো, অ্যালকোহল সেবন এবং বিভিন্ন সংক্রমণসহ ৩০টি পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি উপাদান ৭.১ মিলিয়ন নতুন ক্যান্সার কেসের সঙ্গে যুক্ত। এই সংখ্যা পূর্বের অনুমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা ক্যান্সার প্রতিরোধে ঝুঁকি উপাদান নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বকে পুনরায় তুলে ধরে।
পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি উপাদানগুলোর মধ্যে ধূমপান, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা, বায়ু দূষণ এবং অ্যাসবেস্টসের মতো শিল্পজনিত টক্সিন অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া উচ্চ দেহের ভর সূচক (BMI), শারীরিক সক্রিয়তার অভাব, ধূমবিহীন তামাক ও আচারনাট, নির্দিষ্ট স্তন্যদান পদ্ধতি এবং অতিবেগুনী রশ্মি (UVR) ও ঝুঁকি বাড়ায়।
এই গবেষণায় প্রথমবারের মতো সংক্রামক এজেন্টগুলোকে ঝুঁকি উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে হেপাটাইটিস বি এবং মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) উল্লেখযোগ্য। এই সংক্রমণগুলো নির্দিষ্ট প্রকারের ক্যান্সার, বিশেষ করে গলা ও সেবোরিক ক্যান্সার, ঘটাতে পারে এবং প্রতিরোধযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে কিছু অঞ্চলে HPV-সংশ্লিষ্ট ক্যান্সার এখনও উচ্চ স্তরে রয়েছে, যদিও সেসব রোগের প্রতিরোধমূলক টিকাদান ও স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম বিদ্যমান। লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্যও স্পষ্ট, যেখানে পুরুষ ও নারীর মধ্যে নির্দিষ্ট ঝুঁকি উপাদানের প্রভাব ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়।
গবেষকরা উল্লেখ করেন যে ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য শুধুমাত্র ঝুঁকি উপাদান কমানোই যথেষ্ট নয়; স্বাস্থ্যসেবা সেবার প্রাপ্যতা ও গুণগত মানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উন্নত দেশগুলোতে স্ক্রিনিং ও প্রাথমিক নির্ণয়ের সুবিধা বেশি, ফলে প্রতিরোধযোগ্য কেসের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
ইসাবেল সোরজোমাটাম বলেন, বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে আমরা ক্যান্সারকে শুরু হওয়ার আগে প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারি। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে ব্যক্তিগত আচরণ পরিবর্তন এবং নীতি স্তরে ঝুঁকি উপাদান নিয়ন্ত্রণের সমন্বয়ই মূল চাবিকাঠি।
এই ফলাফল নীতি নির্ধারকদের জন্য স্পষ্ট সংকেত দেয় যে ধূমপান ও অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাবার প্রচার, শারীরিক কার্যকলাপ বাড়ানো এবং পরিবেশগত দূষণ হ্রাসের জন্য শক্তিশালী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে, HPV ও হেপাটাইটিস বি টিকাদানের বিস্তৃত কভারেজ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সাধারণ জনগণের জন্যও কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ রয়েছে: তামাক ও অ্যালকোহল ব্যবহার সীমিত করা, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করা, সুষম খাবার গ্রহণ এবং সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি থেকে রক্ষা পেতে সানস্ক্রিন ব্যবহার করা। এসব অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
ক্যান্সার প্রতিরোধের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও জনসচেতনার সাথে যুক্ত হলে, ভবিষ্যতে ক্যান্সার কেসের সংখ্যা কমে যাবে বলে আশা করা যায়। আপনি কি আপনার দৈনন্দিন জীবনে এই পরিবর্তনগুলো গ্রহণের জন্য প্রস্তুত?



