গত মঙ্গলবার, ঢাকা শহরের পুরনো সরকারি বাসভবনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের সীমিত উদ্বোধনী সফর অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা জাদুঘরটি পরিদর্শন করেন, যা সরকারী বাসভবনকে রূপান্তর করে গড়ে তোলা হয়েছে। জাদুঘরটি আগামী সপ্তাহের শেষের দিকে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হবে।
শেখ হাসিনার পূর্ব সরকারি বাসভবনকে গণভবনে রূপান্তর করে এই জাদুঘর নির্মিত হয়েছে। সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী রূপান্তরের পেছনের ধারণা ও লক্ষ্য ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, জাদুঘরটি দেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়কে চিহ্নিত করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষামূলক সম্পদ হিসেবে কাজ করবে।
উদ্বোধনী সফরের শুরুতে উপস্থিত কূটনীতিকরা এক মিনিটের নীরবতা পালন করেন, যা শাসনামলে শহীদ হওয়া প্রায় চার হাজার মানুষের স্মরণে করা হয়। এই মুহূর্তটি অতীতের শোক ও ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিকে একত্রে প্রকাশ করে। নীরবতা শেষে উপদেষ্টারা জাদুঘরের মূল বার্তা তুলে ধরেন।
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জাদুঘরের উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা ও তাৎপর্য সম্পর্কে কূটনীতিকদের বিস্তারিত জানিয়ে দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দুঃশাসনের পুনরাবৃত্তি শুধুমাত্র বাংলাদেশে নয়, বিশ্বে কোনো স্থানেই না ঘটুক, এটাই মূল লক্ষ্য। জাদুঘরটি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।
‘এই জাদুঘরের মূল ভাবনা হল—এ ধরনের দুঃশাসনের পুনরাবৃত্তি যেন শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর কোথাও না ঘটে,’ ফারুকী উল্লেখ করেন। তিনি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেন জাদুঘরের রাজনৈতিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এটি শেখ হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রামের প্রতিফলন।’ তিনি যোগ করেন, জাদুঘরটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ৩৬ দিনের চূড়ান্ত পর্যায়কে পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী দুঃশাসনের উপাদানগুলোকে তুলে ধরে। এই প্রদর্শনীগুলো জনগণের সংগ্রাম ও দৃঢ়সঙ্কল্পের সাক্ষ্য বহন করে।
প্রধান কিউরেটর তানজিম ওয়াহাব জাদুঘরের বিভিন্ন প্রদর্শনী ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে উপস্থিত কূটনীতিক ও অতিথিদের জানিয়ে দেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিটি নিদর্শন ঐ সময়ের ঘটনার বাস্তব চিত্র উপস্থাপন করে এবং কিছু অংশে ইন্টারেক্টিভ উপাদান যুক্ত করা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার সফরের সুযোগ পেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘জাদুঘরটি অনুপ্রেরণাদায়ক এবং ইতিহাসের গুরুত্ব, গণঅভ্যুত্থান কীভাবে সংঘটিত হয় এবং ২০২৪ সালের বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের উৎপত্তি সম্পর্কে শক্তিশালী স্মারক।’ মিলার জোর দিয়ে বলেন, এই ধরনের স্মৃতি স্থান ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গণতন্ত্রের রক্ষায় সচেতন করবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আলজেরিয়া, আর্জেন্টিনা, ভুটান, ডেনমার্ক, মিশর, ফ্রান্স, ইরান, ইতালি, নরওয়ে, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন, রাশিয়া, স্পেন, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপানসহ মোট একাধিক দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও সফরে অংশ নেন।
সরকারের এসডিজি সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং সংস্কৃতি সচিব মো. মফিদুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। তারা জাদুঘরের সামাজিক-রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের সমন্বয় নিয়ে মতবিনিময় করেন।
সীমিত উদ্বোধনী সফরের পর জাদুঘরটি আগামী সপ্তাহের শেষের দিকে সাধারণ নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত হবে। উন্মুক্তিকরণে দর্শকরা ২০২১ সালের জুলাই মাসে ঘটিত গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাবলী, তার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুঃশাসনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ পাবে। জাদুঘরের পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষামূলক কর্মশালা ও গাইডেড ট্যুরও অনুষ্ঠিত হবে।
এই স্মৃতি জাদুঘরটি দেশের রাজনৈতিক স্মৃতিচারণে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। অতীতের শোক ও সংগ্রামকে স্মরণ করে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক নীতি রক্ষার জন্য একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, জাদুঘরের উন্মুক্তি জনমত গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে এবং সরকারকে অতীতের দায়িত্বের মুখোমুখি করতে উৎসাহিত করবে।



