নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন ৩ ফেব্রুয়ারি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় জানিয়েছেন, রমজান মাসের আগমনের ফলে কিছু ব্যবসায়ী লাইটার জাহাজকে ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার করে কৃত্রিম পণ্য সংকট তৈরি করছে। তিনি তিন দিনের মধ্যে লাইটার জাহাজে পৌঁছানো পণ্য সম্পূর্ণভাবে খালাস না করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের পাশাপাশি কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্কতা জানান।
এই নির্দেশনা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য পরিবহনের জন্য নিয়োজিত লাইটার জাহাজের সংকট সমাধানের উদ্দেশ্যে গৃহীত হয়েছে। উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, রমজান মাসে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম বাড়াতে কিছু অসদাচরণকারী ব্যবসায়ী জাহাজকে অস্থায়ী গুদাম হিসেবে ব্যবহার করে পণ্যের সরবরাহকে নিয়ন্ত্রণে রাখছে। ফলে বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যা শেষ গ্রাহকের জন্য মূল্যবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে।
উল্লেখিত সময়সীমা পূরণে ব্যর্থ হলে নৌপরিবহন অধিদপ্তরকে দ্রুত একটি তালিকা প্রস্তুত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই তালিকা গণমাধ্যমে প্রকাশের মাধ্যমে জনসাধারণকে অবহিত করা হবে এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করতে অনুরোধ করা হবে। তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর উপর আর্থিক ও আইনি শাস্তি আরোপের সম্ভাবনা থাকবে।
সঙ্কট নিরসনে গঠিত তিনটি বিশেষ টাস্কফোর্স নারায়ণগঞ্জ, যশোর ও নোয়াপাড়া সহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। এই টাস্কফোর্সগুলো লাইটার জাহাজের চলাচল পর্যবেক্ষণ, অননুমোদিত পণ্য সংরক্ষণ ও অতিরিক্ত সময়ে জাহাজ থামিয়ে রাখা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর নজরদারি করছে। গত ১৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানগুলিতে মোট ৪৫৫টি জাহাজের পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে।
পরিদর্শনের ফলস্বরূপ ৪০ দিনের বেশি সময় ধরে খাদ্যপণ্য বহনকারী ১৩টি জাহাজের উপর জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। জরিমানার পরিমাণ ও শর্তাবলী সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল, তবে লক্ষ্য হল অনধিকৃত পণ্য সংরক্ষণে দেরি করা ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহের স্বচ্ছতা বাড়িয়ে মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হবে।
লাইটার জাহাজের ট্র্যাকিং ও ব্যবস্থাপনা সহজতর করতে ৩০ জানুয়ারি ‘লাইটার ভেসেল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার’ চালু করা হয়েছে। সফটওয়্যারটি রিয়েল-টাইমে জাহাজের অবস্থান, লোডিং ও আনলোডিং সময় এবং পণ্যের ধরন রেকর্ড করে, যা নৌপরিবহন অধিদপ্তরকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। প্রযুক্তি ভিত্তিক এই ব্যবস্থা ভবিষ্যতে অনিয়মিত লোডিং ও কৃত্রিম সংকটের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, লাইটার জাহাজের মাধ্যমে ‘ভাসমান গুদাম’ তৈরি করা ব্যবসায়ীরা মূলত মৌসুমী পণ্যের দাম বাড়িয়ে মুনাফা বাড়াতে চেয়েছেন। রমজান মাসে খাবারের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের কৃত্রিম ঘাটতি গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে, ফলে সামগ্রিক বাজারে মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হয়। লাইসেন্স বাতিলের হুমকি ও কঠোর তদারকি ব্যবসায়ীদের স্বল্পমেয়াদী লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদে সুনাম ও আইনি নিরাপত্তা বজায় রাখতে বাধ্য করবে।
অগ্রিম সতর্কতা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ভবিষ্যতে অনুরূপ কৃত্রিম সংকটের সম্ভাবনা কমাতে পরিকল্পনা করছে। বিশেষ টাস্কফোর্সের নিয়মিত অভিযান, সফটওয়্যার ভিত্তিক ট্র্যাকিং এবং লাইসেন্স বাতিলের কঠোর শর্তাবলী একসাথে কাজ করে বাজারের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করবে। ব্যবসায়িক পরিবেশে এই ধরনের নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতা রমজান ও অন্যান্য উৎসবের সময়ে মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে।
সারসংক্ষেপে, নৌপরিবহন উপদেষ্টা ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের নির্দেশনা লাইটার জাহাজের অপব্যবহার বন্ধ, কৃত্রিম পণ্য সংকট দূরীকরণ এবং বাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত। তদুপরি, টাস্কফোর্সের কার্যক্রম, জরিমানা ও সফটওয়্যার চালু করা ব্যবসায়িক নীতি ও আইনি কাঠামোর শক্তিশালীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। এই নীতি বাস্তবায়ন হলে রমজান মাসে পণ্যের সরবরাহ ও দামের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকবে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।



