বসন্তের প্রথম মাসে ইউরোপীয় ব্লিস্টার পোকা (Meloe proscarabaeus) এর শুঁয়োপোকা মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে ঘাসের ডালপালায় উঠে উজ্জ্বল কমলা রঙের গুচ্ছ গঠন করে, যা দেখতে ফুলের মতো। এই গুচ্ছের গন্ধের গঠন এমন যে মৌমাছি তা ফুলের সুগন্ধের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে পারে। ফলে মৌমাছি কাছাকাছি এলে শুঁয়োপোকা দ্রুত তার পা দিয়ে লেগে যায় এবং মৌমাছির বাসায় ফিরে যাওয়ার পথে তার ডিমের ওপর আক্রমণ করে।
বৈজ্ঞানিক দল জানুয়ারি ১৫ তারিখে biorxiv-এ প্রকাশিত গবেষণায় এই আচরণের রসায়নিক ভিত্তি উন্মোচন করেছে। গবেষকরা শুঁয়োপোকা যে গন্ধ উৎপন্ন করে তা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে এতে মোট ১৭টি উদ্ভিদজাত গন্ধের উপাদান রয়েছে, যার মধ্যে লিনালুল নামের এক সুগন্ধি অণুও অন্তর্ভুক্ত, যা ল্যাভেন্ডার গন্ধের জন্য পরিচিত এবং বাণিজ্যিক পারফিউমে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়।
প্রায়োগিক কাজের জন্য গবেষকরা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারী পোকা সংগ্রহ করে গ্রীনহাউসে বড় করে তুলেছেন, যেখানে পোকাগুলোকে গমের ঘাস, ফাঁসা এবং ক্লোভার দিয়ে খাওয়ানো হয়। প্রজননের পর মাদার পোকা ডিম পাড়ে, এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শুঁয়োপোকা বেরিয়ে আসে, যা তৎক্ষণাৎ ঘাসের শীর্ষে উঠে যায়। গবেষকরা সূক্ষ্ম ব্রাশ দিয়ে শুঁয়োপোকা সংগ্রহ করে গন্ধের রাসায়নিক বিশ্লেষণ পরিচালনা করেন।
বিশ্লেষণের ফলাফল দেখায় যে শুঁয়োপোকা এই গন্ধগুলো নিজে থেকে তৈরি করে, কোনো উদ্ভিদ থেকে গ্রহণ করে না। দুটি নির্দিষ্ট এনজাইমের সাহায্যে তারা লিনালুলকে পরিবর্তন করে গন্ধের বৈচিত্র্য বাড়ায়, ফলে একটি জটিল এবং আকর্ষণীয় সুগন্ধি মিশ্রণ গঠন হয়। এই প্রক্রিয়া শুঁয়োপোকাকে ফুলের গন্ধের নকল করতে সক্ষম করে, যা মৌমাছির অনুসন্ধান তত্ত্বকে সরাসরি লক্ষ্য করে।
গন্ধের কৃত্রিম সংস্করণ তৈরি করে গবেষকরা বন্য লাল মেসন মৌমাছি (Osmia bicornis) এর সঙ্গে পছন্দ পরীক্ষা চালান। পরীক্ষায় দেখা যায় যে কিছু নির্দিষ্ট গন্ধের সংমিশ্রণ বিশেষ করে মাদার মৌমাছির জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়, যা তাদের শুঁয়োপোকা দ্বারা ফাঁদে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ায়। এই ফলাফল শুঁয়োপোকা কীভাবে মৌমাছির আচরণকে প্রভাবিত করে তা স্পষ্ট করে।
এই আবিষ্কারটি প্রাণী জগতে উদ্ভিদ-অনুকরণী গন্ধের প্রথম নথিভুক্ত উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পূর্বে জানা যায় যে কিছু উদ্ভিদ প্রাণীর চেহারার নকল করে শিকারীকে বিভ্রান্ত করে, তবে এখন দেখা যাচ্ছে যে কিছু প্রাণী সরাসরি উদ্ভিদের গন্ধকে নকল করে তাদের শিকারীকে আকৃষ্ট করে।
শুঁয়োপোকা ও মৌমাছির এই জটিল পারস্পরিক ক্রিয়া বিবর্তনের নতুন দিক উন্মোচন করে, যা পরস্পর নির্ভরশীলতা ও প্রতিযোগিতার সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে প্রকাশ করে। ভবিষ্যতে এ ধরনের রসায়নিক নকলের গবেষণা কীভাবে অন্যান্য পরজীবী ও তাদের হোস্টের মধ্যে সম্পর্ককে প্রভাবিত করে তা জানার দরকার।
বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের মতে, এই ফলাফলগুলো পার্কে বা বাগানে মৌমাছি রক্ষার জন্য নতুন কৌশল বিকাশে সহায়তা করতে পারে, কারণ গন্ধের নকলের মাধ্যমে কীভাবে পরজীবী মৌমাছিকে ফাঁদে ফেলছে তা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
এই গবেষণায় ব্যবহৃত পদ্ধতি ও ফলাফল আন্তর্জাতিক রসায়ন ও ইকোলজি ক্ষেত্রের গবেষকদের জন্য মূল্যবান রেফারেন্স সরবরাহ করে। বিশেষ করে পারফিউম শিল্পে ব্যবহৃত লিনালুলের নতুন সংশ্লেষণ পদ্ধতি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য হতে পারে।
শুঁয়োপোকা যে গন্ধ উৎপন্ন করে তা কেবল একক অণু নয়, বরং বহু উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত একটি জটিল সুগন্ধি প্যালেট, যা মৌমাছির স্বাভাবিক ফুলের গন্ধের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই জটিলতা শুঁয়োপোকার রসায়নিক অভিযোজনের উচ্চ স্তরকে নির্দেশ করে।
গবেষকরা উল্লেখ করেন যে শুঁয়োপোকা কীভাবে এই এনজাইমগুলো বিকাশ করেছে তা এখনও সম্পূর্ণভাবে বোঝা যায়নি, এবং এই বিষয়ে আরও জেনেটিক গবেষণা প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, ইউরোপীয় ব্লিস্টার পোকার শুঁয়োপোকা ফুলের গন্ধ নকল করে মৌমাছিকে আকৃষ্ট করে, যা পরজীবী ও হোস্টের মধ্যে নতুন পারস্পরিক ক্রিয়ার উদাহরণ দেয়। এই আবিষ্কার বিজ্ঞান ও কৃষি উভয় ক্ষেত্রেই নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য সমৃদ্ধ ক্ষেত্র তৈরি করে।
পাঠকরা যদি এই বিষয়ের উপর আরও তথ্য জানতে চান, তবে সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা ও আপডেটেড গবেষণা অনুসরণ করা উপকারী হবে।



