আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১ গাজীপুরে ২০১৬ সালে সংঘটিত ‘অ্যান্টি‑মিলিট্যান্ট অপারেশন’ে সাত যুবকের মৃত্যু সংক্রান্ত মামলায় শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে। প্রোসিকিউশন দল উল্লিখিত ঘটনার জন্য প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রাক্তন গৃহমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং আটজন উচ্চপদস্থ প্রাক্তন পুলিশ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করেছে। অভিযোগের ভিত্তি হল অপারেশনটি পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়ে তরুণদের মৃত্যুর কারণ হয়েছে বলে প্রমাণের উপস্থিতি।
অভিযুক্তদের মধ্যে দুইজন প্রাক্তন আইজিপি, এ.কে.এম শাহিদুল হক এবং মোহাম্মদ জাভেদ পাটওয়ারি অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও প্রাক্তন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, প্রাক্তন কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম, প্রাক্তন বগুড়া সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ মো. আসাদুজ্জামান এবং গাজীপুরের প্রাক্তন এসপি ও পরবর্তীতে ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের প্রধান হারুন‑ওর‑রশিদকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অতিরিক্তভাবে প্রাক্তন অতিরিক্ত এসপি আরিফুর রহমান মন্ডল এবং সিটিটিসি স্বাট ইউনিটের প্রাক্তন সহকারী কমিশনার জাহাঙ্গীরকে মামলায় যুক্ত করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল অভিযোগগুলো স্বীকার করে পরবর্তী শুনানির তারিখ ১৯ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করেছে। এই তারিখে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে উপস্থিত হতে হবে এবং মামলার মূল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে। বিচারিক প্রক্রিয়ার এই ধাপটি মামলার অগ্রগতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য করা হচ্ছে।
প্রসিকিউশন দলের প্রধান গাজি মনাওয়ার হোসেন তামিম আদালতে জানিয়েছেন যে স্বাট (বিশেষ অস্ত্র ও কৌশল) ইউনিটের সদস্যরা অপারেশনটি সম্পন্ন করেছে। তামিমের মতে, স্বাটের সদস্যরা অপারেশনের লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে পূর্বে কোনো তথ্য পাননি, শুধুমাত্র একটি কার্যক্রমের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ফলে তারা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়নি, বরং নির্দেশিত এলাকায় প্রবেশ করে কাজ সম্পন্ন করেছে।
অভিযুক্তদের মধ্যে এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, প্রাক্তন সিটিটিসি প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম, অপারেশনটির পরিকল্পনা ও সমন্বয় করার দায়িত্বে ছিলেন বলে তামিম উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেন যে অপারেশনটি শীর্ষ কমান্ডারদের আদেশে পরিচালিত হয় এবং স্বাট ইউনিটকে তা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। এই তথ্য অনুযায়ী, অপারেশনটি কেবলমাত্র ‘অ্যান্টি‑মিলিট্যান্ট’ নামে গোপনীয়ভাবে চালানো হয়েছিল।
তামিম যুক্তি দেন যে যদি শিকারেরা প্রকৃত মিলিট্যান্ট হতো, তবে তারা সশস্ত্রভাবে প্রতিরোধ করত। তবে ঘটনাস্থলে গুলি চালানোর পর সাতজন যুবক মুখ নিচে করে শোয়ায় শোয়ায় পাওয়া যায়, যা কোনো প্রতিরোধের চিহ্ন দেখায় না। এই পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শিকারেরা কোনো অস্ত্র বহন করছিল না এবং তারা হঠাৎ গুলি চালিয়ে মারা গেছেন।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গৃহীত তদন্তের ফলাফলও আদালতে উপস্থাপিত হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা পরে প্রোসিকিউশন সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির হন এবং তার রিপোর্টের বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করেন। তামিমের মতে, তদন্তকারী কর্মকর্তার রিপোর্ট মূল প্রথম তথ্য রিপোর্ট (এফআইআর) এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল এবং তা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশে প্রস্তুত করা হয়েছিল।
বিচারক মো. শোফিয়ুল আলম মাহমুদের প্রশ্নে তামিম স্পষ্ট করেন যে তদন্তকারী কর্মকর্তার রায়ে উল্লেখিত বিষয়গুলো এফআইআর-এ উল্লেখিত ঘটনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তিনি আরও জানান যে রিপোর্টটি উচ্চতর কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুসারে গৃহীত হয়েছিল, যা অপারেশনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
এই মামলায় উল্লিখিত সকল প্রাক্তন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চালু হওয়ায় দেশের নিরাপত্তা সংস্থার অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালীর স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১ এর এই পদক্ষেপকে আইনি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরবর্তী শুনানিতে প্রমাণের বিশদ বিশ্লেষণ, সাক্ষীদের বর্ণনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের রক্ষা যুক্তি উপস্থাপিত হবে। মামলার ফলাফল গাজীপুরে ২০১৬ সালের ঘটনার সত্যতা উন্মোচনে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ অপারেশনগুলোতে দায়িত্ব নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা চলেছে, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার রক্ষার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে।



