প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত সাম্প্রতিক সমীক্ষা প্রকাশ করেছে যে, দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষককে পাঠদান ছাড়াও ৩৭ ধরণের অ‑পেশাগত কাজ সম্পন্ন করতে হচ্ছে। সমীক্ষা অনুসারে, মোট শিক্ষকশক্তির ৮৭ শতাংশই এই অতিরিক্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত, যা শিক্ষার গুণগত মানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
সমীক্ষাটি জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) পরিচালনা করে, এবং ঢাকার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে মঙ্গলবার একটি অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের উপস্থিতিতে ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে সমীক্ষার মূল ফলাফল সংক্ষেপে তুলে ধরা হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশ্নোত্তর সেশনও অনুষ্ঠিত হয়।
গবেষণায় ৮টি বিভাগ, ২১টি জেলা ও ৫০টি উপজেলায় অবস্থিত ৮৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। মোট ৪৬৪ জন শিক্ষক—যার মধ্যে ৭৯ জন প্রধান শিক্ষক ও ৩৮৫ জন সহকারী শিক্ষক—এই সমীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন, যা দেশের প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তৃত চিত্র উপস্থাপন করে। সমীক্ষা করা এলাকাগুলোতে এক কোটির বেশি শিক্ষার্থী এবং চার লক্ষেরও বেশি শিক্ষক সেবা দিচ্ছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষকরা মূল পাঠদান, শ্রেণি কার্যক্রম, মূল্যায়ন ও সহশিক্ষা ইত্যাদি পেশাগত কাজের পাশাপাশি ৩৭টি ভিন্ন অ‑পেশাগত কাজের দায়িত্বে নিযুক্ত। এই কাজগুলোর মধ্যে ভোটার তালিকা প্রস্তুতি, জন্ম‑মৃত্যু জরিপ, শিশু জরিপ, গ্রামীন উন্নয়ন প্রকল্পের তথ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় প্রশাসনিক কাজের সহায়তা অন্তর্ভুক্ত। কিছু শিক্ষককে স্থানীয় নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ভোটার তালিকা যাচাইয়ের কাজেও যুক্ত করা হয়।
প্রতিটি কাজের সময় ব্যয় ভিন্ন হলেও, জরিপ সংক্রান্ত কাজগুলোতে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করা হয়; বিশেষ করে জন্ম‑মৃত্যু ও শিশু জরিপে শিক্ষকরা গড়ে প্রায় আট ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করেন। অন্যদিকে, বিদ্যালয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও হোম ভিজিটের জন্য বরাদ্দ সময় সর্বনিম্ন থাকে, যা প্রায় দুই ঘণ্টা মাত্র। এই সময়ের পার্থক্য শিক্ষকের মূল দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনতা সৃষ্টি করে।
গড়ে, একজন শিক্ষক মাসে প্রায় ২৪ ঘণ্টা অ‑পেশাগত কাজের জন্য অতিরিক্ত কাজের সময় ব্যয় করেন। এই অতিরিক্ত সময়ের ফলে শিক্ষকের মূল শিক্ষাদানের সময় কমে যায় এবং ক্লাসে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়। ফলে শিক্ষার্থীর শিখনফল এবং ক্লাসরুমের গতি দুটোই প্রভাবিত হয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, অ‑পেশাগত কাজের অতিরিক্ত বোঝা শিক্ষার মান, শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং শিক্ষার্থীর শিখনফল কমিয়ে দিচ্ছে। মন্ত্রণালয় এই সমস্যার সমাধানে কাজের বণ্টন পুনর্বিবেচনা এবং শিক্ষককে মূল শিক্ষাদানের দিকে মনোযোগী করার আহ্বান জানিয়েছে।
সারাদেশে বর্তমানে ৬৫,৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে এক কোটির বেশি শিক্ষার্থী এবং চার লক্ষেরও বেশি শিক্ষক সেবা দিচ্ছেন। সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ সংখ্যা ৩,৬৯,২১৬, যার মধ্যে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ কর্মরত, ফলে পদবিন্যাসে কিছু ফাঁক রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি অ‑পেশাগত কাজের চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
শিক্ষক ও বিদ্যালয় প্রশাসনকে সুপারিশ করা হচ্ছে যে, অ‑পেশাগত কাজের পরিকল্পনা ও বরাদ্দে স্বচ্ছতা আনা এবং শিক্ষকের মূল দায়িত্বে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। পাশাপাশি, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিয়ে কাজের চাপ কমিয়ে শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করা সম্ভব। শিক্ষকেরা যদি সময় ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বাড়িয়ে এবং প্রয়োজনীয় সমর্থন চেয়ে কাজের ভারসাম্য রক্ষা করেন, তবে শিক্ষার্থীর শিখনফলও উন্নত হবে।



