বাংলাদেশ সরকার নতুন শিক্ষা আইন খসড়া প্রণয়ন করেছে, যার লক্ষ্য শারীরিক শাস্তি ও মানসিক নিপীড়ন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা এবং কোচিং‑সেন্টার, নোট‑গাইড ও প্রাইভেট টিউশনি ধীরে ধীরে বিলুপ্ত করা। আইন কার্যকর হওয়ার তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এসব ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হবে বলে খসড়া নির্দেশ করে।
এই খসড়া প্রথমবার ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি গৃহীতের পরপরই শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রস্তুত করেছিল, তবে দেড় দশকেরও বেশি সময়ে তা অনুমোদন পায়নি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে একাধিকবার চূড়ান্ত সংস্করণ পাঠানো হলেও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের কারণে প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। সর্বশেষে ২০১৮ সালে মন্ত্রিপরিষদে জমা দেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুনরায় সংশোধন করা হয়।
প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, আইন প্রয়োগের পর সরকার কোচিং‑সেন্টার, নোট‑গাইড এবং ব্যক্তিগত টিউশনি কার্যক্রমের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধারাবাহিকভাবে নিরুৎসাহিত করে তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কোচিং‑সেন্টার এবং নোট‑গাইডের পাশাপাশি প্রাইভেট টিউশনি ক্ষেত্রেও একই ধরণের বিধিনিষেধ থাকবে। এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হল শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত বাণিজ্যিকায়ন রোধ করে শিক্ষার মৌলিক গুণগত মান বজায় রাখা।
শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি মানসিক নিপীড়নেও কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়েছে। খসড়া স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে শাস্তি দিতে বা মানসিকভাবে দমন করতে পারবেন না। এই ধারা লঙ্ঘন করলে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
তবে শিক্ষার্থীর মঙ্গল বা প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য যৌক্তিক ও মানবিক শৃঙ্খলাবদ্ধ অনুশাসন অনুমোদিত থাকবে। এমন ক্ষেত্রে শিক্ষককে অভিভাবককে জানাতে হবে এবং অনুশাসনের সীমা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের এই নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করবে। লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যা পূর্বে কোনো নির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি ছাড়াই পরিচালিত হতো না।
বর্তমানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করার জন্য কোনো বিশেষ আইন কার্যকর নয়; সর্বশেষ নির্দেশনা ২০১১ সালের ২১ এপ্রিল প্রকাশিত একটি পরিপত্রে দেওয়া হয়েছিল। যদিও সরকারী নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও স্কুলে শারীরিক ও মানসিক শাস্তির অভিযোগ নিয়মিতভাবে উঠে আসে।
শিক্ষা সংক্রান্ত এই অভিযোগগুলো হরহামেশাই শোনা যায়, যা নির্দেশ করে যে নীতি ও বাস্তবের মধ্যে এখনও ফাঁক রয়ে গেছে। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা প্রায়ই স্থানীয় শিক্ষাকেন্দ্র বা জেলা শিক্ষা অফিসে অভিযোগ দায়ের করে, তবে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবের কারণে সমস্যার সমাধান ধীরগতিতে হয়।
শিক্ষা আইনের এই নতুন খসড়া পূর্বের প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা, যেখানে ২০১০ সালে শিক্ষানীতি গৃহীতের পরপরই আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তবে দীর্ঘ সময়ের অগ্রগতির অভাবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৮ সালের মন্ত্রিপরিষদে জমা দেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুনরায় খসড়া প্রস্তুত করা হয় এবং এখন সরকারী অনুমোদনের পথে রয়েছে।
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ: যদি কোনো শিক্ষার্থীকে শারীরিক বা মানসিক শাস্তি দেওয়া হয়, তবে তা সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বা জেলা শিক্ষা অফিসে লিখিতভাবে জানানো উচিত। এছাড়া, শিক্ষার্থীর অধিকার রক্ষার জন্য স্থানীয় শিশু অধিকার সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। ভবিষ্যতে এই নতুন আইন কার্যকর হলে, শিক্ষার পরিবেশে আরও নিরাপদ ও ন্যায়সঙ্গত পরিবেশ গড়ে তোলার আশা করা যায়।



