ঢাকা শহরের গুলশানের আলায়েন্স ফ্রঁসেজে ২৩ জানুয়ারি থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ‘ইন্টু মাই লাংস’ শিরোনামের মাল্টিমিডিয়া প্রদর্শনীতে তুলা শিল্পের শ্রমিকদের শ্বাসনালীর রোগের বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। শিল্পী আইমান আলআজরাক ও ইমানুয়েল স্বেডিনের যৌথ সৃষ্টিকর্মটি তুলা থ্রেডকে সংযোগের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে শ্রমিক, যন্ত্র, কাপড় এবং শেষ গ্রাহকের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ঝুঁকিগুলোকে দৃশ্যমান করে।
প্রদর্শনীর মূল ধারণা থ্রেডের শারীরিক গঠন ও তার সংযোগের ভূমিকা থেকে শুরু হয়। থ্রেডের মাধ্যমে শ্রমিক থেকে যন্ত্র, যন্ত্র থেকে কাপড়, কাপড় থেকে দোকান এবং শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের হাতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় যে, এই সিস্টেমে শ্বাসনালীর রোগকে স্বাভাবিক হিসেবে গৃহীত করা হয়েছে। শিল্পীরা কেবল কষ্টকে নান্দনিক রূপে উপস্থাপন করেননি, বরং একটি স্বীকৃত বা অস্বীকৃত শিল্পিক কাঠামোকে মানচিত্রে রূপান্তরিত করেছেন যেখানে রোগের উপস্থিতি দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী ডিজাইনার লিয়াম আলজাফরি ও কিউরেটর ফৌজিয়া মাহিন চৌধুরীও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। আলজাফরি ও আলআজরাকের প্যালেস্টাইনীয় বংশোদ্ভূত পটভূমি তাদের কাজের মধ্যে স্থানচ্যুতি, শ্রম ও বেঁচে থাকার বিষয়গুলোকে সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপন করতে সহায়তা করেছে। চৌধুরী, যিনি শিল্পীদের সঙ্গে কাজের পরিধি নির্ধারণের জন্য মাঠে গবেষণা করেছেন, বলেন যে, এই প্রদর্শনীটি শ্রমিকদের মুখোমুখি হওয়া কষ্টকে আলোকিত করার একটি দায়িত্বশীল প্রচেষ্টা।
প্রদর্শনীতে বেশ কয়েকটি ইনস্টলেশন রয়েছে, তবে প্রতিটি কাজের আকার ছোট হলেও তার প্রভাব গভীর। দর্শকদের জন্য একটি গাইডেড পথ তৈরি করা হয়েছে, যা তুলা স্পিনিং শিল্পের শ্রমিকদের শ্বাসনালীর অভ্যন্তরে প্রবেশের অভিজ্ঞতা দেয়। মূল বিষয়বস্তু হল বায়সিনোসিস, যা তুলা ধুলোতে দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে সৃষ্ট একটি পেশাগত শ্বাসনালীর রোগ। এই রোগের ফলে শ্রমিকদের শ্বাসকষ্ট, কাশি ও শ্বাসের সময় শ্বাসের শব্দ (ওয়িস্পারিং) দেখা যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুসারে, তুলা শিল্পে কাজ করা প্রায় ১০ লক্ষ শ্রমিকের মধ্যে ১-২ লক্ষের বেশি বায়সিনোসিসের ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশে তুলা স্পিনিং শিল্পে প্রায় ২ লক্ষ কর্মী নিয়োজিত, যার মধ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশেরই শ্বাসনালীর সমস্যার লক্ষণ দেখা যায়। রোগের প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ হল ধূলিকণার উচ্চ ঘনত্ব, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকা কর্মস্থল এবং সুরক্ষামূলক মাস্কের অভাব।
বায়সিনোসিসের প্রাথমিক লক্ষণগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং শ্বাসের সময় শ্বাসের শব্দ অন্তর্ভুক্ত। রোগটি অগ্রসর হলে ফুসফুসের কার্যকারিতা হ্রাস পায় এবং গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টের কারণে কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। চিকিৎসা পদ্ধতিতে প্রথমে ধূলিকণার সংস্পর্শ কমানো, সঠিক শ্বাসযন্ত্রের সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার এবং নিয়মিত মেডিকেল চেক-আপ অন্তর্ভুক্ত। রোগের অগ্রগতি রোধে শ্বাসযন্ত্রের ফিজিওথেরাপি ও ওষুধের ব্যবহার করা হয়।
প্রদর্শনীতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য কিছু বাস্তবিক সুপারিশও উপস্থাপিত হয়েছে। প্রথমত, কর্মস্থলে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা এবং ধূলিকণার স্তর কমাতে ফিল্টারযুক্ত ভেন্টিলেশন সিস্টেম স্থাপন করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, শ্রমিকদের জন্য সঠিক ফিটিং মাস্ক ও রেসপিরেটর সরবরাহ করা এবং তাদের ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান করা উচিত। তৃতীয়ত, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং বায়সিনোসিসের প্রাথমিক লক্ষণ সনাক্তকরণের জন্য স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু করা প্রয়োজন।
শিল্পের দায়িত্বশীল অংশীদারদেরও এই রোগের মোকাবিলায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। উৎপাদন সংস্থা, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং সরকারী সংস্থা একসাথে কাজ করে কর্মস্থলের নিরাপত্তা মানদণ্ড উন্নত করতে পারে। বিশেষ করে, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য বীমা ও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা, পাশাপাশি কর্মস্থলে নিরাপত্তা প্রশিক্ষণকে বাধ্যতামূলক করা উচিত।
‘ইন্টু মাই লাংস’ প্রদর্শনীটি শুধুমাত্র শিল্পের একটি দৃষ্টান্ত নয়, বরং একটি সামাজিক আহ্বান যে, শ্রমিকদের শ্বাসনালীর স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা আর সহ্য করা যাবে না। এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে জনসাধারণের সচেতনতা বাড়বে এবং নীতিনির্ধারকরা যথাযথ পদক্ষেপ নিতে প্রেরণা পাবে।
শ্বাসের স্বাস্থ্যের গুরুত্বকে উপেক্ষা না করে, তুলা শিল্পের সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষকে একত্রে কাজ করে বায়সিনোসিসের ঝুঁকি কমাতে এবং শ্রমিকদের সুস্থ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আপনার মতামত কী? আপনি কি মনে করেন, এই ধরনের শিল্পকর্ম সমাজে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে?



