দিল্লি ভিত্তিক আন্তর্জাতিক আইন সংস্থা হোয়াইট অ্যান্ড কেস এলএলপি (White & Case LLP)কে বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী প্রশাসন এস আলম গ্রুপের আরবিট্রেশন মামলায় প্রতিরক্ষা করার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই সিদ্ধান্তটি আজ সরকারী ক্রয় কমিটি অনুমোদন করে, যা দেশের সম্পদ জব্দের বিরুদ্ধে চলমান আইনি চ্যালেঞ্জের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
ক্রয় কমিটির অনুমোদন পাওয়ার পর ফাইন্যান্স উপদেষ্টা সালেহুদ্দিন আহমেদ এই নিয়োগের বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, সরকার আরবিট্রেশন নোটিশের প্রতি দ্রুত সাড়া দিতে চায়। হোয়াইট অ্যান্ড কেসের সঙ্গে চুক্তিতে ঘণ্টাপ্রতি ১,২৫০ মার্কিন ডলার (প্রায় ১,৫২,৬৯১ টাকা) ফি নির্ধারিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানের আইনি সেবা নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হোয়াইট অ্যান্ড কেস যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত একটি শীর্ষস্থানীয় গ্লোবাল আইন সংস্থা, যার সদর দফতর যুক্তরাষ্ট্রে এবং ৩১টি দেশে ৪৬টি অফিস রয়েছে। বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও বিরোধ নিষ্পত্তি ক্ষেত্রে এর বিস্তৃত অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা এই আরবিট্রেশন মামলায় বাংলাদেশকে কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে।
মামলাটি বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্র (ICSডি)‑এ দাখিল করা হয়েছে। আরবিট্রেশন নোটিশের বিষয়বস্তু অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে পরিচিত এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ সাইফুল আলম এবং তার পরিবার সরকারী সম্পদ জব্দকে ২০০৪ সালের বাংলাদেশ‑সিঙ্গাপুর দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।
দাবিদাররা দাবি করেন, অস্থায়ী সরকার তাদের সম্পদ জব্দের মাধ্যমে একটি “ভয় দেখানোর ক্যাম্পেইন” চালিয়েছে, যা বিনিয়োগ চুক্তির সুরক্ষা বিধি লঙ্ঘন করেছে। তারা যুক্তি দেন, এই পদক্ষেপগুলো তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং আন্তর্জাতিক আইনি রক্ষার অধিকার লঙ্ঘন করেছে।
এস আলম গ্রুপ ব্যাংকিং, এনার্জি ও খাদ্য শিল্পে বিস্তৃত ব্যবসা পরিচালনা করে এবং দেশের অন্যতম বড় কংগ্লোমারেট হিসেবে পরিচিত। সরকারী তদন্তে গ্রুপের ব্যাংকিং সেক্টরে ১৫ বছর ধরে চলা শাসনকালে বিলিয়ন ডলারের হেরফেরের অভিযোগ উঠে এসেছে, যা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।
এই আরবিট্রেশন মামলাটি সরকারী সম্পদ জব্দের ব্যাপক অভিযানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে গৃহীত অ্যান্টি-দুর্নীতি পদক্ষেপের বৈধতা ও কার্যকারিতা এখন আইনি পর্যালোচনার মুখে, যা দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।
বাজার পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করছেন, আন্তর্জাতিক আইন সংস্থার অংশগ্রহণের ফলে মামলার জটিলতা কিছুটা হ্রাস পেতে পারে, তবে আরবিট্রেশন প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে এবং এর ফলে আর্থিক ও সুনামগত ঝুঁকি বাড়তে পারে। হোয়াইট অ্যান্ড কেসের ফি এবং আইনি ব্যয়ের পরিমাণ সরকারী বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে যখন দেশের আর্থিক অবস্থা ইতিমধ্যে সংকটময়।
ভবিষ্যতে যদি সরকার আরবিট্রেশন ফলাফলে অনুকূল রায় পায়, তবে এটি সম্পদ জব্দের আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করতে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, যদি বিরোধী পক্ষের দাবিগুলি স্বীকৃত হয়, তবে সরকারকে আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে, যা আর্থিক দিক থেকে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এই পরিস্থিতি দেশের বিনিয়োগ নীতি, আইনি কাঠামো এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।



