মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ঢাকা শহরে জাপান ও বাংলাদেশ দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ সরকারের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসান এবং জাপানের বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি। এই স্বাক্ষরকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায় যে, চুক্তি সইয়ের সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়েছে এবং তা অবিলম্বে প্রয়োগে আনা হবে। মন্ত্রণালয় আরও উল্লেখ করেছে যে, এই পদক্ষেপটি উভয় দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে শক্তিশালী করবে।
চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হল দুই দেশের সরকারকে একটি আইনি কাঠামো প্রদান করা, যার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময় করা যাবে। এতে নজরদারি ব্যবস্থা, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং অন্যান্য উচ্চ প্রযুক্তি পণ্য অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বিশেষত, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে সহায়ক প্রকল্পে এই সরঞ্জাম ব্যবহার করা হবে বলে উল্লেখ আছে।
প্রতিটি হস্তান্তরের জন্য অনুমোদন ও যাচাই প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে, এবং উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এই প্রক্রিয়ার তত্ত্বাবধান করবে। এছাড়া, সরঞ্জামের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য মৌলিক নীতিমালা এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে।
চুক্তিতে তৃতীয় পক্ষের কাছে সরঞ্জাম হস্তান্তর বা নির্ধারিত উদ্দেশ্যের বাইরে ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিধানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, এবং লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে। এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এই চুক্তি জাপানের প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশকে আধুনিকায়নের পথে অগ্রসর করবে। তারা আশা প্রকাশ করেন যে, সহযোগিতার মাধ্যমে উভয় দেশের রপ্তানি-আমদানি পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হবে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, জাপান ইন্দো‑প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব বিস্তারের একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে এই চুক্তিকে দেখছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ তার প্রতিরক্ষা ক্রয়কে ঐতিহ্যবাহী সরবরাহকারীদের বাইরে বিস্তৃত করে স্বনির্ভরতা বাড়াতে চাচ্ছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে চুক্তিটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই চুক্তি পূর্বে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন চুক্তির ধারাবাহিকতা, যার মধ্যে ডিসেম্বর ২০২৫-এ স্বাক্ষরিত একটি স্মারক চুক্তি এবং নভেম্বর ২০২৫-এ সমান ধরনের সহযোগিতা চুক্তি অন্তর্ভুক্ত। এই ধারাবাহিকতা দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে ধীরে ধীরে গভীরতর করে চলেছে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে, জাপান ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপাইনের সঙ্গে অনুরূপ প্রযুক্তি‑হস্তান্তর চুক্তি সম্পন্ন করেছে, যা সামুদ্রিক ও আকাশীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে। এই উদাহরণগুলো জাপানের নিরাপত্তা সহযোগিতার বিস্তৃত নীতি প্রতিফলিত করে।
বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন, চুক্তির অধীনে প্রথম যৌথ প্রকল্পগুলি আগামী বারো মাসের মধ্যে শুরু হতে পারে, শর্তসাপেক্ষে প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন এবং রপ্তানি‑নিয়ন্ত্রণ অনুমোদন সম্পন্ন হলে। এই সময়সীমা উভয় দেশের পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণ সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
দুই সরকারই নিশ্চিত করেছে যে, এই অংশীদারিত্ব আন্তর্জাতিক অ-প্রসারণ নীতিমালা মেনে চলবে এবং বিদ্যমান বহুপাক্ষিক কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করবে। এ ধরনের সমন্বয় অঞ্চলীয় নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন, যা চুক্তির কৌশলগত গুরুত্বকে তুলে ধরেছে। জাপানের দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে দু’দেশের সহযোগিতার প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন।



