অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মঙ্গলবার শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে interim সরকারকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতার দায়ে অভিযুক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার ডিপিওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষর করতে চাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজকে ৩০ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করতে পারে।
আনু মুহাম্মদ বলেন, এই ধরনের চুক্তি করার কোনো আইনগত বা নৈতিক অনুমোদন interim সরকারের কাছে নেই, তবু সরকার দ্রুত এবং অস্বচ্ছভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, যারা এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছে তাদের বিরুদ্ধে শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং দায়িত্বশীলদের বিচারের ব্যবস্থা করা উচিত।
তিনি বিশেষভাবে জোর দেন, চুক্তি স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তাদের দেশ ত্যাগের সুযোগ না দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য তিনি সরকারের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান।
সমাবেশটি গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি আয়োজন করে, যা ডিপিওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি প্রত্যাহার এবং বন্দর শ্রমিকদের কর্মবিরতির সমর্থনে অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠকরা উল্লেখ করেন, চুক্তি স্বাক্ষরের আগে সব পণ্যের ওপর মাশুল বাড়ানো হয়েছে, ফলে আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি খরচ বৃদ্ধি পাবে।
আনু মুহাম্মদের মতে, বিদেশি কোম্পানির হাতে টার্মিনাল হস্তান্তরের ফলে দেশের আয় ও মাশুল হ্রাস পাবে, যা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তিনি এও উল্লেখ করেন, চুক্তির শর্তাবলী অস্বচ্ছ এবং নিয়মবহির্ভূত, যা জনস্বার্থের বিরোধী।
তিনি আরও বলেন, interim সরকারের উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীরা বিদেশি লবিস্টদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, এবং প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস সাহেবকে বিদেশি কোম্পানি ও রাষ্ট্রের লবিস্টদের নিয়োগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আনু মুহাম্মদ উল্লেখ করেন, হাশিনা আমলে গৃহীত জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি থেকে বের হওয়ার দায়িত্ব interim সরকারেরই ছিল, কিন্তু তা সম্পন্ন হয়নি। তিনি সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি তীব্রভাবে তুলে ধরেন।
অন্তর্বর্তী সরকার ডিপিওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পেছনে দেশের বন্দর অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার লক্ষ্য রাখে বলে দাবি করে। তবে সরকার থেকে চুক্তির নির্দিষ্ট শর্তাবলী ও আর্থিক প্রভাব সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশিত হয়নি।
ডিপিওয়ার্ল্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি প্রধান বন্দর পরিচালনা সংস্থা, পূর্বে বিশ্বের বিভিন্ন বন্দর পরিচালনা করে আসছে। চুক্তির আওতায় এনসিটি পরিচালনা ও উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদী লিজ প্রদান করা হবে বলে জানা যায়।
আনু মুহাম্মদের বক্তব্যের পর সমাবেশে উপস্থিত অংশগ্রহণকারীরা সরকারের ওপর চুক্তি প্রত্যাহার এবং বন্দর শ্রমিকদের দাবির পক্ষে স্লোগান তুলেছেন। তারা জোর দিয়ে বলেছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের আগে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জনমত সংগ্রহ করা উচিত ছিল।
প্রতিবাদী গোষ্ঠী দাবি করে, যদি চুক্তি চালু হয় তবে দেশের বাণিজ্যিক স্বায়ত্তশাসন হ্রাস পাবে এবং বিদেশি কোম্পানির হাতে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সুবিধা চলে যাবে। এদিকে, সরকারী পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য বা ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়নি।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই চুক্তি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হতে পারে, এবং শ্বেতপত্র প্রকাশের মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহি করা হবে। আনু মুহাম্মদের দাবি অনুযায়ী, যদি সরকার দায়িত্বশীলদের বিচারের ব্যবস্থা না করে, তবে ভবিষ্যতে অনুরূপ চুক্তি স্বাক্ষরের ঝুঁকি বাড়বে।
সমাবেশের শেষে অংশগ্রহণকারীরা সরকারের ওপর চুক্তি বাতিলের পাশাপাশি বন্দর শ্রমিকদের কর্মবিরতি সমর্থনে একতাবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সমাপনী বক্তব্য রাখেন। এই আন্দোলন দেশের বন্দর নীতি ও আন্তর্জাতিক লিজ চুক্তির স্বচ্ছতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা উসকে দিতে পারে।



