চীন বাণিজ্যিক জাহাজকে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর কৌশলগত কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এই ধারণা সাম্প্রতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধজাহাজের সরাসরি ধ্বংসের চেয়ে পুরো অপারেশনাল সিস্টেমকে অকার্যকর করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হল আধুনিক যুদ্ধের কেন্দ্রীয় নোডগুলো—কমান্ড ও কন্ট্রোল নেটওয়ার্ক, গোয়েন্দা ও নজরদারি ব্যবস্থা, লজিস্টিক সাপ্লাই চেইন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা—কে আঘাত করা। চীনের সামরিক পরিকল্পনাবিদরা বিশ্বাস করেন, এই সংযোগস্থলগুলোতে আঘাত হানলে শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ অক্ষত থাকলেও সামগ্রিক বাহিনী কার্যত অচল হয়ে পড়তে পারে।
ওয়াইজে-১৮সি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে এই পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। র্যান্ড কর্পোরেশনের মার্চ ২০২৩ প্রকাশিত প্রতিবেদনে গবেষকরা উল্লেখ করেন, এই ক্ষেপণাস্ত্রের পরিসীমা ও নির্ভুলতা বাণিজ্যিক জাহাজের গোপনীয়তা ব্যবহার করে শত্রুর নেটওয়ার্কে প্রবেশের সম্ভাবনা বাড়ায়। ফলে মার্কিন নৌবাহিনীর দীর্ঘ দূরত্বের নজরদারি ও প্রতিক্রিয়া ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন, ভবিষ্যতে কন্টেইনারাইজড লঞ্চ সিস্টেম বা বাণিজ্যিক জাহাজের গুদামস্থলীর নিচে ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনের ধারণা বাস্তবায়িত হতে পারে। এই পদ্ধতি ঐতিহ্যবাহী সামরিক জাহাজের তুলনায় সনাক্তকরণে কঠিন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুটে গোপনীয়ভাবে চলতে সক্ষম।
তবে এই কৌশলের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের জানুয়ারি ২০২৬ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চীন বৃহৎ পরিসরে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে উৎপাদন ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। গাইডেন্স সিস্টেম, ওয়ারহেড অ্যাসেম্বলি এবং উচ্চ শক্তির বিস্ফোরক উপাদানের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো বেশিরভাগই কেন্দ্রীভূত এবং বিকল্পের অভাব রয়েছে।
একটি আঘাতের পর দ্রুত পুনর্গঠন করা কঠিন হওয়ায়, এই সীমাবদ্ধতা চীনের সামরিক পরিকল্পনায় ঝুঁকি তৈরি করে। এছাড়া, উন্নত সেমিকন্ডাক্টর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এই বিষয়গুলো চীনের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের স্থায়িত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জন্য এই নতুন কৌশলটি কেবল অস্ত্রের সংখ্যা নয়, বরং কৌশলগত স্থিতিস্থাপকতার বিষয়। কমান্ড ও কন্ট্রোল নেটওয়ার্কে সম্ভাব্য আঘাতের ফলে শিপিং রুট, ডেটা শেয়ারিং এবং রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্যের প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। ফলে সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব এবং অপারেশনাল দক্ষতা হ্রাস পেতে পারে।
কূটনৈতিক পর্যায়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ইতিমধ্যে এই সম্ভাব্য হুমকির ওপর সতর্কতা প্রকাশ করেছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে, চীনের সামরিক আধুনিকীকরণকে নিয়ন্ত্রণের জন্য দ্বিপাক্ষিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তা জোর দেওয়া হয়েছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই কৌশলটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে, বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরের বাণিজ্যিক রুটে। যদি চীন সফলভাবে বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করে, তবে শিপিং কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য হতে পারে, যা বাণিজ্যিক খরচ বাড়াবে।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ইতিমধ্যে সমুদ্রের ওপর নজরদারি ও প্রতিক্রিয়া ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য অ্যান্টি-সিসি (Cruise Missile) সিস্টেম এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ক্ষমতা উন্নত করার পরিকল্পনা চালু করেছে। এই পদক্ষেপগুলো চীনের নতুন কৌশলের সম্ভাব্য প্রভাবকে কমাতে লক্ষ্যভিত্তিক।
ভবিষ্যতে, দুই দেশের সামরিক নীতির বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তন এই কৌশলের কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে। র্যান্ড এবং হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের গবেষণায় উল্লিখিত সময়সীমা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে চীনের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও স্থাপনের সক্ষমতা স্পষ্টভাবে পরীক্ষা করা হবে। এই মাইলস্টোনগুলোকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে।
সারসংক্ষেপে, চীনের বাণিজ্যিক জাহাজে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনের পরিকল্পনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, তবে উৎপাদন ক্ষমতা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সীমাবদ্ধতা এই কৌশলের বাস্তবায়নকে জটিল করে তুলছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থা এবং দু’দেশের কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো এই বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।



