ইজরায়েলি সরকার গাজা অঞ্চলে ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ) সহ ৩৬টি মানবিক সংস্থার কাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে গাজা ও পশ্চিম তীরের রোগী ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর সরাসরি প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা। নিষেধাজ্ঞা গত ডিসেম্বরের একটি ঘোষণার পর কার্যকর হয়েছে, যখন ইজরায়েলি সরকার ফিলিস্তিনি কর্মীদের তথ্য না দেওয়ার অভিযোগ তুলে এই পদক্ষেপ নেয়।
এমএসএফের মহাসচিব ক্রিস্টোফার লকইয়ার জেনেভায় সংস্থার সদর দপ্তরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, বর্তমান সময়ে ফিলিস্তিনিদের জন্য সংকটের মাত্রা সর্বোচ্চ এবং মানবিক সহায়তার চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, যদি সংস্থার কার্যক্রম হ্রাস পায় বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়, গাজা ও পশ্চিম তীরের রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হবে। লকইয়ারের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা গাজাবাসীর জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় চলমান যুদ্ধের পর থেকে এমএসএফ চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সংস্থা স্থানীয় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু রাখার পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান করে আসছে। গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর তাদের অংশগ্রহণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য, যা মানবিক সংকটের মাঝেও সেবা চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এমএসএফ গাজার মোট হাসপাতাল শয্যার প্রায় ২০ শতাংশ পরিচালনা করে এবং ২০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র সক্রিয়ভাবে চালু রয়েছে। এই কেন্দ্রগুলোতে রোগীর মৌলিক চিকিৎসা, শল্যচিকিৎসা এবং জরুরি সেবা প্রদান করা হয়। হাসপাতাল শয্যার এই অংশীদারিত্ব গাজার স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক।
লকইয়ার জানান, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এমএসএফ গাজায় ৮ লক্ষের বেশি চিকিৎসা পরামর্শ প্রদান করেছে, এক লক্ষের বেশি ট্রমা রোগীর চিকিৎসা করেছে এবং ১০ হাজারের বেশি নবজাতকের প্রসবে সহায়তা করেছে। এছাড়া সংস্থা ৭০ কোটি লিটারের বেশি পানির সরবরাহ নিশ্চিত করেছে, যা পানীয় ও স্যানিটেশন সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই পরিসংখ্যানগুলো গাজার মানবিক চাহিদার মাত্রা ও এমএসএফের অবদানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
ইজরায়েলি সরকারের দাবি অনুযায়ী, এমএসএফের দুই কর্মী হামাস ও ইসলামিক জিহাদের সঙ্গে যোগাযোগের সন্দেহ রয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে সরকার গাজায় এমএসএফসহ অন্যান্য সংস্থার কাজ বন্ধের নির্দেশ দেয়। তবে সংস্থা এই অভিযোগকে কঠোরভাবে অস্বীকার করেছে এবং তাদের কর্মীদের কোনো রাজনৈতিক বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ নেই বলে জোর দিয়েছে।
ইজরায়েলি সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও জাতিসংঘের তীব্র নিন্দা প্রকাশ পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো গাজায় চলমান অবরোধের ফলে মানবিক সংকট বাড়বে বলে সতর্ক করেছে এবং ইজরায়েলি সরকারের সিদ্ধান্তকে মানবিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে। নিন্দা সত্ত্বেও নিষেধাজ্ঞা বজায় রয়েছে, যা গাজার স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক সেবার ওপর চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
লকইয়ারের মতে, গাজার বর্তমান পরিস্থিতি ইতিমধ্যে সংকটের শীর্ষে রয়েছে এবং মানবিক সহায়তা কমে গেলে রোগীর মৃত্যুহার বাড়তে পারে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গাজায় মানবিক সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। ভবিষ্যতে যদি নিষেধাজ্ঞা না তুলে নেওয়া হয়, গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়বে এবং মানবিক সংকটের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে।



