রাশিয়া আজকের রাত থেকে কিয়েভ ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে জ্বালানি সিস্টেমের ওপর বৃহৎ আকারের আক্রমণ চালায়। এই হামলা দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহকে গুরুতর সীমাবদ্ধ অবস্থায় নিয়ে আসে এবং শীতল তাপমাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে নাগরিকদের জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব ফেলেছে।
বেসরকারি জ্বালানি সংস্থা DTEK অনুযায়ী, এই আক্রমণটি এই বছর পর্যন্ত রাশিয়ার সর্ববৃহৎ শক্তি ব্যবহার করে করা হয়েছে। সংস্থা উল্লেখ করেছে যে, একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বয়ে পরিচালিত এই অভিযানটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
কিয়েভের পাশাপাশি হরকিভ, খারকিভ এবং অন্যান্য শহরে লক্ষ্যবস্তু স্থাপন করা হয়, ফলে বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের কার্যক্রমে গুরুতর সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়। বিশেষ করে কিয়েভের বিদ্যুৎ গ্রিডে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যা শহরের দৈনন্দিন কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছে।
তাপমাত্রা -20°C পর্যন্ত নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিয়েভের এক হাজারেরও বেশি টাওয়ার ব্লকে তাপ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে, পূর্বাঞ্চলের খারকিভে অবস্থিত একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায় এবং তা মেরামতের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
উক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার এই পদক্ষেপকে “সন্ত্রাস ও উত্তেজনা বেছে নেওয়া” হিসেবে উল্লেখ করে, এবং মস্কোর ওপর আন্তর্জাতিক মিত্রদের সর্বোচ্চ চাপ আরোপের আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলছেন যে, কূটনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে রাশিয়া যুদ্ধের তীব্রতা বাড়াচ্ছে।
এই আক্রমণটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে রাশিয়া ও উক্রেনের মধ্যে গৃহীত “শক্তি সমঝোতা” চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই ঘটেছে। চুক্তিটি সপ্তাহান্তে সমাপ্ত হওয়ায় উভয় পক্ষের মধ্যে কোনো তাপমাত্রা না থাকা অবস্থায় সংঘর্ষ পুনরায় তীব্র হয়েছে।
আক্রমণের দিন ন্যাটো সেক্রেটারি-জেনারেল মার্ক রুটে কিয়েভে উপস্থিত ছিলেন এবং উক্রেনের পার্লামেন্টে একটি বক্তৃতা দেন। রুটের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই মুহূর্তে উক্রেনকে সমর্থন জানানোর ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগ মূলত কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করার জন্য ছিল, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে রাশিয়া ও উক্রেনের প্রতিনিধিরা এই সপ্তাহের শেষের দিকে আবু ধাবিতে পুনরায় আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবে বর্তমান আক্রমণটি দেখায় যে রাশিয়া এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে উপেক্ষা করে নিজের সামরিক পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে।
রাশিয়ার ধারাবাহিক বড় আকারের আক্রমণ এবং তার মধ্যে বিরতির ফাঁকগুলো উক্রেনীয় নাগরিকদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি করেছে যে কোনো বাস্তবিক বিরতি নেই। প্রথম বিস্ফোরণটি মধ্যরাতের কাছাকাছি কিয়েভে শোনা যায় এবং পুরো আকাশযুদ্ধ প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে।
বিস্ফোরণের পরপরই অতিরিক্ত বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে, যা শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নাগরিকদের আশ্রয়কে কঠিন করে তোলে। শীতের তীব্রতা বিবেচনা করে, বহু পরিবার মেট্রোর স্টেশনগুলোতে আশ্রয় নেয় এবং কিছুজন প্ল্যাটফর্মে তাঁবু বসিয়ে শীতের ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা পায়।
জেলেনস্কি উল্লেখ করেছেন যে, এই আক্রমণে ৭০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এছাড়া ৪৫০টি ড্রোনও আকাশযুদ্ধের অংশ হিসেবে চালু করা হয়েছে, যা উক্রেনের বায়ু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে ফেলেছে।
উক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে যে, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে মাত্র ৩৮টি সফলভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, ফলে বাকি অধিকাংশ লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছেছে। এই সংখ্যা বায়ু প্রতিরক্ষার কার্যকারিতা ও রাশিয়ার আক্রমণের তীব্রতার মধ্যে পার্থক্যকে স্পষ্ট করে।
সরকারি কর্মকর্তারা বারবার রাশিয়ার আক্রমণের সময় পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা মিসাইলের অভাবের কথা উল্লেখ করছেন, যা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। এই ঘাটতি ভবিষ্যতে আরও বড় আক্রমণকে প্রতিহত করার ক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে।
আসন্ন আবু ধাবি আলোচনার ফলাফল এবং ন্যাটোর অতিরিক্ত সমর্থন উভয়ই রাশিয়ার সামরিক চালনা থামাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দেখায় যে, রাশিয়া কূটনৈতিক পথের পরিবর্তে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে তার লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।



