দ্য ডেইলি স্টার কনফারেন্স হলে, ঢাকা, ১২ ফেব্রুয়ারি—জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একই দিনে জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোট সম্পর্কে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রাক্তন সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম স্পষ্ট বক্তব্য রাখেন। তিনি ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের পদ্ধতিকে অপ্রয়োজনীয় ও প্রতারণাপূর্ণ বলে উল্লেখ করে বলেন, এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে জয়ী হতে দেওয়া হবে না।
এই গণভোটটি দেশের সংবিধানিক পরিবর্তন সংক্রান্ত, যা জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হবে এবং ভোটের ফলাফল সরাসরি দেশের আইনগত কাঠামোকে প্রভাবিত করবে। সেলিমের মতে, ভোটের দুই বিকল্পই বাস্তবিক কোনো অর্থ বহন করে না, কারণ ফলাফল পূর্বনির্ধারিত এবং জনগণের সত্যিকারের ইচ্ছা প্রতিফলিত হয় না।
‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে যারা দাঁড়িয়েছেন, তাদের ইতিমধ্যে হারের মুখে দেখা দিয়েছে, সেলিম ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, যদি সিদ্ধান্তের দায়িত্ব সরাসরি জনগণের হাতে ছেড়ে দেওয়া হতো, তবে তারা স্বয়ং বুঝতে পারত যে ‘হ্যাঁ’ পছন্দের কোনো বাস্তবিক ভিত্তি নেই। বর্তমান পরিস্থিতি সরকারী তহবিলের ব্যবহার এবং প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে গঠিত, যা ভোটের স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ন করে।
সেলিমের আহ্বান ছিল দেশের পাহাড়ি ও সমতল অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য সক্রিয়ভাবে কথা বলা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর দীর্ঘদিন থেকে দুর্বল এবং সামাজিক কাঠামো তাদের ধারাবাহিকভাবে বঞ্চিত করেছে। এই বঞ্চনা তাদের মৌলিক অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন ব্যবস্থার কথা বলা হলেও, সেলিম উল্লেখ করেন, বাস্তবে সমাজের সব স্তরে বৈষম্য এখনও বিদ্যমান। তিনি বলেন, দেশের শাসনব্যবস্থা জনগণের ইচ্ছা ও চাহিদার ভিত্তিতে হওয়া উচিত, কিন্তু বর্তমানে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলি সংস্কারকে পেছনে ঠেলতে চেষ্টা করছে।
ভবিষ্যতে যদি দরিদ্র, মেহনতি ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষিত না করা হয়, তবে আবারো বৃহৎ জনঅভ্যুত্থান ঘটতে পারে, এটাই সেলিমের সতর্কতা। তিনি উল্লেখ করেন, জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ না হলে সামাজিক অস্থিরতা পুনরায় উন্মোচিত হবে এবং তা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ন করবে।
এই আলোচনাটি বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম আয়োজন করে, যা দেশের আদিবাসী যুব সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে গঠিত। ফোরামটি জাতীয় পর্যায়ে এই বিষয়টি উত্থাপন করতে এবং নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টিগোচর করতে চায়। ফোরামের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সতেজ চাকমা আলোচনার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
চাকমা উল্লেখ করেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয় যদি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে পেছনে রাখা হয়। তিনি বলেন, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও এই সমস্যাকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি, ফলে আদিবাসী জনগণের অধিকার হ্রাস পেয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা কাপেং ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ওপর মোট ৯৩টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে ৪১টি ঘটনা রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, এবং মোট নয়টি ভিন্ন ধরণের অধিকার লঙ্ঘন রেকর্ড করা হয়েছে।
এই তথ্যগুলো সেলিমের বক্তব্যকে সমর্থন করে, যে বর্তমান নীতি ও প্রশাসনিক পদ্ধতি আদিবাসী জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকারকে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো গণঅভ্যুত্থানের ঝুঁকি না থাকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, সেলিমের এই অবস্থান এবং আদিবাসী যুব ফোরামের উদ্যোগ দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন দিক যোগ করেছে। যদি সরকার এই উদ্বেগগুলোকে উপেক্ষা করে, তবে পরবর্তী নির্বাচনে আদিবাসী ভোটারদের সমর্থন হারানোর সম্ভাবনা বাড়বে।
সারসংক্ষেপে, জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোটের ফলাফলকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে না ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের দৃঢ় অবস্থান এবং আদিবাসী অধিকার সংক্রান্ত তথ্যগুলো দেশের নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। ভবিষ্যতে এই বিষয়গুলো কীভাবে সমাধান হবে, তা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সংহতির জন্য নির্ধারক হবে।



