দ্বিতীয় ফেব্রুয়ারি রাতের দিকে রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরাম (বিআইজিএফ) আয়োজন করে দলীয় ইশতেহারে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স সংক্রান্ত অঙ্গীকার ও অগ্রাধিকার নিয়ে গোলটেবিল আলোচনা। এই সভা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, আইটি বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার নেতারা অংশ নেন। আলোচনার মূল বিষয় ছিল দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ, নাগরিক অধিকার, নির্বাচনোত্তর নীতিগত দিক এবং বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশের প্রণয়ন। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সাশ্রয়ী ইন্টারনেট, ডেটা সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়গুলোকে দলীয় ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর সবার একমত হয়।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ওয়াহিদুজ্জামান উল্লেখ করেন, দল ক্ষমতায় এলে প্রথম ১৮০ দিনের জন্য একটি স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হবে। এই সময়ে পূর্ববর্তী সরকারের আইটি বাজেট ও ব্যয়ের ওপর অডিট চালু করা হবে এবং বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় হলে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নতুন আইন প্রণয়নের কাজ শুরু হবে।
বিআইজিএফের চেয়ারপার্সন আমিনুল হাকিম রেডানডেন্সি বাড়াতে অন্তত পাঁচ থেকে দশটি সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকারকে এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার আহ্বান জানান। হাকিমের মতে, নীতিগত ঘাটতির কারণে ফেসবুক, গুগল, ইউটিউবের মতো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্ট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্বো)-এর মহাসচিব ফয়সাল আলিম রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটাককে বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের পক্ষে মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বেসরকারিকরণে সেবা মান ও প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের উপকারে আসবে।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন কমিশনের (বিএনএনআরসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম বজলুর রহমান সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল (এসওএফ) এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি তহবিলের ব্যবহার ও হিসাবরক্ষণে স্পষ্টতা না থাকলে জনসাধারণের বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে উল্লেখ করেন।
ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) অধ্যাপক ড. খন্দকার এ. মামুন জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত এআই নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এআই প্রযুক্তি দ্রুত উন্নয়ন পাচ্ছে; সঠিক নীতিমালা ছাড়া তা নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও নৈতিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
এই বৈঠকের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর এবং বিআইজিএফের ভাইস চেয়ারপার্সন সাইমুম রেজা তালুকদার। তিনি ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের আন্তর্জাতিক মান ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দেশের নীতি নির্ধারণে প্রাসঙ্গিক দৃষ্টিকোণ প্রদান করেন।
বৈঠকের শেষে অংশগ্রহণকারীরা সম্মিলিতভাবে একটি সংক্ষিপ্ত সুপারিশ তালিকা প্রস্তুত করেন। এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে আইটি বাজেটের স্বচ্ছতা, ডেটা সুরক্ষার জন্য আইন প্রণয়ন, সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ, এআই নীতিমালার কাঠামো গঠন এবং আন্তর্জাতিক ক্যাবল সংযোগের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন।
বিআইজিএফ এই সুপারিশগুলোকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে উপস্থাপন করার পরিকল্পনা জানায়। তারা আশা করে, নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে এই অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের ডিজিটাল পরিবেশ আরও নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।
বৈঠকের আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকতা আম্বার আইটি লিমিটেডের মাধ্যমে করা হয়। এই ধরনের পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে প্রযুক্তি নীতি গঠনে বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
বিআইজিএফের নীতি দলিলের শেষাংশে উল্লেখ করা হয়েছে, ভবিষ্যতে নিয়মিতভাবে এমন গোলটেবিল আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে, যাতে ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের বিষয়গুলো রাজনৈতিক ইশতেহারে ধারাবাহিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং বাস্তবায়নের জন্য স্পষ্ট দিকনির্দেশনা তৈরি হয়।



