অন্তর্বর্তী সরকার র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এর নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল ইন্টারভেশন ফোর্স’ (এসআইএফ) করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই সিদ্ধান্তটি মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোর কমিটির সভা শেষে জানানো হয়। নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি ইউনিফর্মের নকশা ও রঙেও পরিবর্তন আনা হবে বলে জানানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সভার শেষে র্যাবের পুনর্নামকরণ ও ইউনিফর্ম পরিবর্তনের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, র্যাবের কাঠামো ও কার্যক্রমের ব্যাপক পর্যালোচনার পরই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং নতুন ইউনিফর্মের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
র্যাবের নাম পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে বাহিনীর কার্যক্রমের পুনর্মূল্যায়ন এবং জনসাধারণের আস্থা পুনর্গঠনকে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, র্যাবের পূর্বের কার্যক্রম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোকে পুনরায় যাচাই করে, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনর্গঠন করা হবে।
র্যাবের ইতিহাসে প্রথমে এটিকে র্যাপিড অ্যাকশন টিম (র্যাট) বলা হতো। ২০০৪ সালে খালেদা জিয়ার সরকারের অধীনে র্যাবের বর্তমান রূপ গঠিত হয়। তখন থেকে রাব দেশের নিরাপত্তা বজায় রাখতে বিভিন্ন অপারেশন পরিচালনা করে আসছে, তবে তার কার্যপদ্ধতি ও মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে বহুবার সমালোচনা করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুসারে, রাবের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে, তার অতীতের অপারেশন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোকে পুনরায় মূল্যায়ন করা হবে। কমিশনের মতে, রাবের পুনর্গঠন না হলে জনসাধারণের বিশ্বাস হারানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিএনপি রাবের বিলুপ্তি দাবি করে আসছে। ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাবের অতীত কর্মকাণ্ডকে ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানে গ্যাংগ্রিন হলে কেটে ফেলতে হয়’ এমন রূপক দিয়ে উল্লেখ করেন এবং রাবের সংস্কারের কোনো সুযোগ নেই বলে দৃঢ়ভাবে বলেন।
বিএনপি’র এই অবস্থান সরকারকে কঠোর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। রাবের নাম পরিবর্তন ও ইউনিফর্মের নতুন রূপের মাধ্যমে সরকার সংস্কারমূলক পদক্ষেপের সূচনা করতে চাইলেও, বিরোধী দলের তীব্র বিরোধিতা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। বিশেষত, রাবের মানবাধিকার সংক্রান্ত অভিযোগের পুনঃপর্যালোচনা এবং সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপগুলো রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।
নতুন ‘স্পেশাল ইন্টারভেশন ফোর্স’ের কার্যক্রমের দিকনির্দেশনা ও দায়িত্বের পরিধি এখনো স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়নি। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাবের কাঠামো ও মিশন পুনর্গঠন করে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি মানবাধিকার রক্ষার মানদণ্ডকে শক্তিশালী করা হবে।
রাবের নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি, ইউনিফর্মের রঙ, ডিজাইন ও চিহ্নের নতুন রূপও শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে। এই পরিবর্তনগুলোকে রাবের পুনঃব্র্যান্ডিংয়ের অংশ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যাতে বাহিনীর চিত্রকে জনসাধারণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করা যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, রাবের পুনর্নামকরণ এবং ইউনিফর্ম পরিবর্তন সরকারকে মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে, তবে বাস্তবিক সংস্কার না হলে এই পদক্ষেপগুলো কেবল চিত্রগত পরিবর্তন হিসেবে রয়ে যাবে। তাই রাবের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে কিনা, তা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিতর্কের মূল বিষয় হবে।
সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে রাবের নতুন নাম ও ইউনিফর্মের আনুষ্ঠানিক আদেশ শীঘ্রই জারি করা হবে বলে জানানো হয়েছে। এই আদেশের মাধ্যমে রাবের সব ইউনিটকে নতুন নাম ও ইউনিফর্মে রূপান্তরিত করার সময়সীমা নির্ধারিত হবে।
রাবের পুনর্নামকরণ ও ইউনিফর্ম পরিবর্তন দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে রাবের অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিরোধী দলের কঠোর অবস্থানকে মাথায় রেখে, সরকারকে বাস্তবিক সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, নতুবা রাজনৈতিক বিরোধ ও জনমত বিরোধের মুখে পড়তে পারে।



