অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মেয়াদে দেশজুড়ে মোট ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে; এ ঘটনাগুলোর ৯১.৯ শতাংশে বিএনপি যুক্ত বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে। ঘটনাগুলোর মধ্যে সাড়ে ৫০০টি ক্ষেত্রে বিএনপি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে, যা রাজনৈতিক উত্তেজনার মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে।
ঢাকার ধানমন্ডি মাইডাস সেন্টারে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। “কর্তৃত্ববাদ পতন পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি” শীর্ষক এই গবেষণাপত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি টিআইবির শাহজাদা এম. আকরাম ও মো. জুলকারনাইন উপস্থাপন করেন।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭ মাসে মোট ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। এসব ঘটনার ফলে ১৫৮জন রাজনৈতিক কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৭,০৮২ জন আহত হয়েছেন। এ সংখ্যা দেশের রাজনৈতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি নির্দেশ করে।
বিএনপি যুক্ত ৫৫০টি ঘটনার পাশাপাশি, আওয়ামী লীগ ১২৪টি (২০.৭ শতাংশ) এবং জামায়াত-এ-ইসলামি ৪৬টি (৭.৭ শতাংশ) ঘটনায় জড়িত বলে টিআইবি রিপোর্ট করেছে। যদিও সংখ্যায় পার্থক্য স্পষ্ট, তবে সকল প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তর্কোন্দল ও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে বলে গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি বিভিন্ন ধরণের সহিংসতার উদাহরণ তুলে ধরে। ঢাকার বিভিন্ন পরিবহন টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড থেকে চাঁদাবাজি, সিলেটের কোয়ারি ও নদ-নদী থেকে পাথর লুটপাট, সেতু, বাজার, ঘাট, বালু মহাল ও জল মহালসহ বিভিন্ন ইজারা নিয়ন্ত্রণের জন্য সংঘর্ষের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনা প্রায়ই স্থানীয় দলীয় কর্মীদের মধ্যে ক্ষমতা-সংগ্রামের ফলস্বরূপ ঘটছে।
টিআইবি বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়াই এই সহিংসতার মূল কারণ। দলীয় কর্মীদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে স্থানীয় স্তরে ক্ষমতার দখল ও নিয়ন্ত্রণের জন্য সহিংসতা স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনের শেষে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সর্বোচ্চ দুর্বলতা দেখেছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় বিভিন্ন অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কা থাকলেও, অর্থ, পেশীশক্তি ও ধর্মের অপব্যবহার বাড়তে দেখা যাচ্ছে, যা সমান প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে সুষ্ঠু নির্বাচনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
ইফতেখারুজ্জামান আরও জানান, নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার প্রবণতা পূর্বের মতোই অব্যাহত রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগ দখলে থাকা প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রমের দখল ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সংঘাতের ঘটনা বাড়ছে। এই পরিস্থিতি নির্বাচনের ফলাফলকে ন্যায়সঙ্গত করার সম্ভাবনাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা শক্তিশালী না করে এবং সহিংসতার মূল কারণগুলো সমাধান না করে, তবে ভবিষ্যতে আরও বেশি সংঘর্ষের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষত, নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে অর্থ, পেশীশক্তি ও ধর্মের অপব্যবহার বাড়লে ভোটারদের নিরাপত্তা ও নির্বাচনের স্বচ্ছতা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তাই, সকল রাজনৈতিক শক্তির জন্য এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।



