১৩তম জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিএনপি’র চারজন প্রভাবশালী নেতার পুত্র প্রথমবারের মতো পার্লামেন্টের সিটের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারি), চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া), চট্টগ্রাম-১০ (পাহাড়তলী‑ডাবল মুরিং) ও চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালি) নির্বাচনী এলাকায় প্রত্যেক প্রার্থী নিজ নিজ পারিবারিক ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। এইবারের প্রার্থী তালিকায় তাদের নাম প্রথমবারের মতো দেখা যাচ্ছে, যা স্থানীয় রাজনীতিতে বংশগত প্রভাবের নতুন দিক উন্মোচন করেছে।
চট্টগ্রাম-৫-এ মির মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, বিএনপি উপ-চেয়ারম্যান মির মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের পুত্র, প্রার্থী হিসেবে দৌড়ে আছেন। নাসির উদ্দিন পূর্বে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এবং সিভিল এভিয়েশন ও ট্যুরিজম মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। হেলাল বর্তমানে বিএনপি চট্টগ্রাম বিভাগে সহকারী সংগঠন সচিব এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করছেন।
হেলাল তার পিতার রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের পাশাপাশি নিজের সংগঠনমূলক ভূমিকা ব্যবহার করে হাটহাজারি জেলায় ব্যাপকভাবে প্রচার চালাচ্ছেন। তিনি প্রতিদিন বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করছেন এবং নিজের কাজের মাধ্যমে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
চট্টগ্রাম-৭-এ হুমাম কাদের চৌধুরী, যিনি একটি প্রভাবশালী বিএনপি পরিবারের সন্তান, প্রার্থী হিসেবে নাম নিবন্ধন করেছেন। যদিও তার পিতার নাম ও পূর্বের পদবী প্রকাশিত হয়নি, তবে স্থানীয় বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে তার পরিবার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও সংগঠনমূলক কাজের মাধ্যমে অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছে। হুমাম কাদের চৌধুরীও নিজের সংগঠনগত দক্ষতা ও পারিবারিক সমর্থনকে একত্রে ব্যবহার করে রাঙ্গুনিয়া জেলায় ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করছেন।
চট্টগ্রাম-১০-এ সাঈদ আল নোমান, প্রয়াত বিএনপি উপ-চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমানের পুত্র, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আল নোমান বহুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং মৎস্য ও পশুপালন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তার পিতা ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এ মৃত্যুবরণ করেন। সাঈদ আল নোমান তার পিতার রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে সম্মান করে, তবে নিজের কর্মদক্ষতা ও সংগঠনমূলক ক্ষমতা দিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জনের লক্ষ্য রাখছেন।
চট্টগ্রাম-১৬-এ মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা, আরেকজন প্রভাবশালী বিএনপি নেতার পুত্র, প্রার্থী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। তার পিতার রাজনৈতিক পরিচয় ও পূর্বের পদবী প্রকাশিত না হলেও, স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করছেন যে পাপ্পা তার পরিবারের রাজনৈতিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে বাঁশখালি জেলায় ভোটারদের সঙ্গে সংলাপ স্থাপন করছেন।
বিএনপি’র উচ্চপদস্থ নেতারা এবং স্থানীয় বিশ্লেষকরা একমত যে এই চারজন প্রার্থীর সামনে পারিবারিক পরিচয়ের বাইরে নিজের রাজনৈতিক সক্ষমতা প্রমাণ করার বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পারিবারিক নামের সুবিধা থাকলেও ভোটাররা এখনো তাদের ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতা, জনসেবা ও সংগঠনমূলক দক্ষতা যাচাই করতে চাইছেন।
বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও এই প্রার্থীদের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও পারদর্শিতা বজায় রাখতে জোর দিয়েছে। পারিবারিক ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে হলেও, পার্টি গঠনমূলক পরিবর্তন ও নতুন নেতৃত্বের বিকাশের জন্য এই প্রার্থীদের পারফরম্যান্স গুরুত্বপূর্ণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিপক্ষ দলগুলোর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এই প্রার্থীদের বংশগত পটভূমি ভোটারদের মধ্যে কিছুটা সন্দেহের সৃষ্টি করতে পারে। তবে একই সঙ্গে, পারিবারিক পরিচয় ভোটারদের মধ্যে পরিচিতি ও বিশ্বাসের ভিত্তি হতে পারে, যা নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, যদি এই প্রার্থীরা নিজেদের কর্মদক্ষতা ও জনসেবার মাধ্যমে ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারেন, তবে বিএনপি’র ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে বংশগত রাজনীতির নতুন দিক উদ্ভাসিত হবে। অন্যদিকে, যদি পারিবারিক নামের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি দেখা যায়, তবে পার্টির পুনর্গঠন ও তরুণ নেতৃত্বের বিকাশে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
চূড়ান্ত ফলাফল যাই হোক না কেন, চট্টগ্রাম জেলায় এই চারজন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেশের রাজনীতিতে বংশগত প্রভাবের পুনরাবৃত্তি ও নতুন দৃষ্টিকোণ উন্মোচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। ভোটারদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে যে পারিবারিক ঐতিহ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে না দিয়ে নতুন নেতৃত্বের ক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতা কতটা মূল্যায়ন করা হবে।
এই নির্বাচনী লড়াইয়ের ফলাফল ভবিষ্যতে বিএনপি’র কৌশলগত দিকনির্দেশনা, পারিবারিক রাজনীতির ভূমিকা এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাজনৈতিক গতিপথে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।



