চট্টগ্রাম বন্দর আজ (মঙ্গলবার) সকাল আটটায় ঘোষিত নতুন ২৪‑ঘণ্টা কর্মবিরতি কার্যকর হওয়ায় রপ্তানি কার্যক্রমে ব্যাঘাত দেখা দিচ্ছে। শ্রমিক ও কর্মচারীরা প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজ বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করেছে, যা বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোর কাজকেও প্রভাবিত করছে।
বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারার সিদ্ধান্তের বিরোধে শ্রমিকরা শনিবার থেকে প্রতিবাদ শুরু করে। এই টার্মিনালটি সরকারি‑বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) ভিত্তিক জি‑টু‑জি চুক্তির আওতায় হস্তান্তর করা হচ্ছিল, যা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনুমোদিত হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর চুক্তি অগ্রসর হওয়ায় কর্মীরা আন্দোলনে নামেন।
প্রতিবাদটি “চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ” এর অধীনে সংগঠিত হয়েছে এবং প্রতিদিন আট ঘণ্টা কর্মবিরতি বজায় রাখার দাবি করা হচ্ছে। সাধারণত বন্দর ও ডিপোর কাজ ২৪ ঘণ্টা চললেও এই নতুন শর্তে কনটেইনারের লোড‑আনলোডে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলো রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনারের সংরক্ষণ, সজ্জা ও জাহাজে লোডিংয়ের দায়িত্বে থাকে। ডিপো থেকে কনটেইনারগুলো সরাসরি বন্দর পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে জাহাজে তোলা হয়। কর্মবিরতির আগে ডিপোগুলোতে প্রায় আট হাজার একক কনটেইনার জাহাজীকরণের অপেক্ষায় ছিল।
সোমবার দুপুর পর্যন্ত এই সংখ্যা দশ হাজারের ঊর্ধ্বে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র তিন দিনের মধ্যে দুই হাজারের বেশি কনটেইনার ডিপোতে জমে গেছে, যা রপ্তানি শৃঙ্খলায় উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে।
বেসরকারি কনটেইনার ডিপো সমিতির মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার জানান, পূর্বে জাহাজের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম থাকায় বড় সমস্যা দেখা যায়নি, তবে এখন কর্মবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হলে রপ্তানি কার্যক্রমে বাস্তবিক বাধা সৃষ্টি হবে। তিনি যোগ করেন, ২৪‑ঘণ্টা বন্ধ থাকলে ডিপো থেকে কনটেইনারগুলো বন্দর পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হবে না, ফলে জাহাজ সময়মতো রওনা দিতে পারবে না।
এই পরিস্থিতি রপ্তানি পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যয়বহুল সংরক্ষণ ও অতিরিক্ত হ্যান্ডলিং খরচ বাড়িয়ে দেবে। গার্মেন্টস, জুট, সামুদ্রিক পণ্য ইত্যাদি মূল রপ্তানি পণ্যের সময়মতো রপ্তানি না হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ক্ষয় হতে পারে এবং বিক্রয় চুক্তিতে জরিমানা আরোপের ঝুঁকি বাড়বে।
শিপিং লাইনগুলোও বিকল্প বন্দর বা রুট বিবেচনা করতে পারে, যা ফ্রেট রেটের উত্থান ঘটাতে পারে। একই সঙ্গে কন্টেইনারের দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণ পোর্টের গুদাম ক্ষমতা হ্রাস করে, নতুন কন্টেইনার গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।
সরকারের জন্য এই বিরোধটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দু’দিক থেকেই চ্যালেঞ্জ। শ্রমিকদের দাবি মেটাতে ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়া দ্রুত সমাধান করতে চাপ বাড়ছে। আইনগত পদক্ষেপ, মধ্যস্থতা বা চুক্তির পুনর্বিবেচনা সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে উঠে আসতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি কর্মবিরতি এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রপ্তানি পরিমাণে উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা দিতে পারে, যা দেশের বাণিজ্য ঘাটতিতে প্রভাব ফেলবে। তাই দ্রুত সমঝোতা ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি, যাতে রপ্তানি শৃঙ্খলায় অতিরিক্ত ব্যাঘাত না ঘটে।
সংক্ষেপে, চট্টগ্রাম বন্দর ও তার পার্শ্ববর্তী ডিপোগুলোর বর্তমান কর্মবিরতি রপ্তানি পণ্যের লজিস্টিক্সে তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। কনটেইনারের স্তূপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংরক্ষণ খরচ, শিপিং সময়সূচি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের বিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সমস্যার সমাধান না হলে দেশের রপ্তানি প্রবাহে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হতে পারে, তাই সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের দ্রুত সমঝোতা প্রত্যাশিত।



