২ ফেব্রুয়ারি, ঢাকা শহরের বি.ই.আর.সি. কার্যালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের “বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি” গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপদেষ্টাদের সৃজনশীলতা হ্রাসের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ক্যাবিনেটের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা কর্মকর্তাদের কাজের চাপ ও সময়ের অভাবের দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার পরিচালনার জন্য সারাদিন ফাইল ও ফোনের ভিড়ের মধ্যে ডুবে থাকা কর্মকর্তাদের সৃজনশীলতা ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
রিজওয়ানা হাসান বলেন, “আমরা ক্যাবিনেটে উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত হিসেবে যোগ দিয়েছি, কিন্তু কাজের অতিরিক্ত চাপের কারণে এখন অর্ধশিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত হিসেবে কাজ করছি”। তিনি যুক্তি দেন, লেখাপড়া ও গবেষণার জন্য সময় না থাকায় কর্মকর্তাদের মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি তাদের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশে বাধা দেয়।
উল্লেখযোগ্যভাবে, তিনি ফাওজুল কবির খানের কাজের প্রশংসা করে বলেন, কঠিন সরকারি কাজের পাশাপাশি বই রচনার দক্ষতা অন্যদের জন্য শিক্ষণীয়। তিনি উল্লেখ করেন, লেখক তার দায়িত্ব পালন করে গৃহীত তথ্য ও বিশ্লেষণকে সুসংগঠিত রূপে উপস্থাপন করেছেন, যা নীতি নির্ধারকদের জন্য মূল্যবান রেফারেন্স হতে পারে। এই প্রশংসা উপদেষ্টাদের মধ্যে গবেষণা ও লেখালেখির গুরুত্বকে পুনরায় জোরদার করে।
বৈশিষ্ট্যপূর্ণভাবে, রিজওয়ানা হাসান প্রশাসনের দলীয়করণ ও আমলাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, একসময় মেধাবী কর্মকর্তাদের গড়ে তোলার জন্য আমলাতন্ত্র কাজ করত, কিন্তু বর্তমানে অতিরিক্ত দলীয়করণ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়ন হওয়ায় সৃজনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। তিনি বলেন, এখন কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন মেধার পরিবর্তে “এদের লোক” বা “ওদের লোক” হিসেবে করা হয়, যা দক্ষতা ও উদ্ভাবনের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি উল্লেখ করেন, আমলাতন্ত্রের ভিতরে সৃষ্ট কষ্ট ও হতাশা বইয়ের “বিসিএস কর্মকর্তাদের বোবা কান্না” অংশে স্পষ্টভাবে ফুটে আছে। রিজওয়ানা হাসান এই অংশকে আমলাতন্ত্রের বাস্তব সমস্যার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মানসিক চাপ ও কর্মপরিবেশের অবনতির দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি এই বিষয়টি তুলে ধরে, নীতি নির্ধারকদের জন্য বাস্তবমুখী সমাধানের প্রয়োজনীয়তা জোর দেন।
উপদেষ্টা গোষ্ঠীর গঠনমূলক সমালোচনার আহ্বান জানিয়ে রিজওয়ানা হাসান বলেন, অপ্রয়োজনীয় সমালোচনার ওপর “লকডাউন” আরোপ করা উচিত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সমালোচনা গঠনমূলক হলে তা নীতি উন্নয়নে সহায়ক, অন্যথায় তা কর্মক্ষমতাকে ক্ষুণ্ণ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি উপদেষ্টাদের কাজের পরিবেশকে আরও স্বচ্ছ ও ফলপ্রসূ করার লক্ষ্যে।
অনুষ্ঠানটি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। উপস্থিতদের মধ্যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়েদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুবউল্লাহ, আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, দুদক (ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সকল উপস্থিতি রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্যে সম্মতি জানিয়ে, উপদেষ্টাদের কাজের পরিবেশ উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন।
এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে, উপদেষ্টাদের সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের জন্য নীতি সংশোধনের সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে। রিজওয়ানা হাসানের মন্তব্যগুলো সরকারী পরামর্শক গোষ্ঠীর কাজের পদ্ধতি ও মূল্যায়ন মানদণ্ডে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়। ভবিষ্যতে এই ধরনের আলোচনা যদি বাস্তব নীতি রূপে রূপান্তরিত হয়, তবে উপদেষ্টাদের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা পুনরায় সজীব হতে পারে, যা বাংলাদেশ সরকারের কার্যকারিতা ও জনসেবা উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।



