২ ফেব্রুয়ারি শনিবার, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের আয়োজনে ‘বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি’ শীর্ষক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল আমলাতন্ত্রের স্থবিরতা ও সংস্কারবিরোধিতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন।
অনুষ্ঠানটি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়েদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুবউল্লাহ, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, দুদক (ডিজিটাল ইউজার ডেটা কমিশন) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন।
ড. আসিফ নজরুলের মতে, বাংলাদেশে আমলারা স্বভাবতই সংস্কারবিরোধী। তিনি এ কথা ব্যক্তিগত দোষ না সিস্টেমের দোষ—এটি স্পষ্ট না হলেও, বাস্তবতা এভাবেই। তার এই মন্তব্যের পেছনে সাম্প্রতিক সময়ে তার ও অন্যান্য উপদেষ্টাদের সম্পর্কে ছড়িয়ে পড়া গুজবের প্রতি হাস্যরসাত্মক প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
একজন ইউটিউবারের দাবি অনুযায়ী, দুদকের চেয়ারম্যান মোমেন ভাইকে ২০০ কোটি টাকা এবং ফাওজুল ভাইকে ৫০ কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। ড. আসিফ এই গুজবকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে প্রত্যাখ্যান করে জানান, মোমেন ভাই সাধারণ জীবনযাপন করেন এবং তিনি নিজেও তেমন কোনো সুবিধা পাননি।
উপদেষ্টা হিসেবে তার কাজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তিনি বলেন, আগে তিনি উপদেষ্টা না থাকলে সারাদিন সমালোচনা শোনতেন এবং মানুষ তাকে তিরস্কার করত। এখন তিনি দিনরাত কাজের মধ্যে লিপ্ত এবং একই সঙ্গে গালিগালাজের শিকার হচ্ছেন। এই পরিবর্তন তার কাজের চাপ ও পরিবেশের পরিবর্তনকে তুলে ধরে।
বৈশিষ্ট্যপূর্ণভাবে, ড. আসিফ উল্লেখ করেন যে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস হোয়াটসঅ্যাপকে অফিসের প্রধান সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করেন এবং অর্ধ ঘন্টার মধ্যে কাজ সম্পন্ন করেন। অন্যদিকে, ২৯-৩০ বছর বয়সী সরকারি কর্মচারীরা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে চিঠি আদান-প্রদান বা দ্রুত কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞ, ফলে ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে স্থানান্তর করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগে।
তিনি আরও বলেন, আমলাতন্ত্রে যথেষ্ট মেধা রয়েছে, তবে তারা অতিরিক্ত স্থবির ও ডগমেটিক হয়ে পড়েছে। অনেক কর্মকর্তা অফিসার হওয়াকে জাতির প্রতি সর্বোচ্চ অবদান হিসেবে দেখেন, কিন্তু দায়িত্ববোধের ঘাটতি রয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি কর্মদক্ষতা ও সেবার মানকে প্রভাবিত করছে।
ড. আসিফের মন্তব্যের মধ্যে সরকারি সেবা সংস্কার ও আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, প্রযুক্তি ব্যবহার ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদাহরণমূলক ভূমিকা নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা গ্রন্থের বিষয়বস্তু ও দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনা করেন। তবে ড. আসিফের ভাষণই প্রধান দৃষ্টিকোণ হয়ে ওঠে, যেখানে তিনি আমলাতন্ত্রের কাঠামোগত সমস্যাকে সরাসরি তুলে ধরেছেন।
এই সমালোচনা সরকারী নীতি নির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আমলাতন্ত্রের সংস্কার না হলে জনসেবা মানের উন্নতি কঠিন হবে, এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নেও বাধা সৃষ্টি হবে।
ড. আসিফের বক্তব্যের পর, উপস্থিত বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকরা আমলাতন্ত্রের সংস্কার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কিভাবে ত্বরান্বিত করা যায় তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন। যদিও নির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রকাশিত হয়নি, তবে ভবিষ্যতে প্রযুক্তি-ভিত্তিক কাজের পদ্ধতি ও দায়িত্বশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগের সম্ভাবনা দেখা যায়।
সারসংক্ষেপে, ড. আসিফ নজরুলের ভাষণে আমলাতন্ত্রের সংস্কারবিরোধী স্বভাব, কাজের অদক্ষতা এবং প্রযুক্তি গ্রহণের অভাব স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তার মন্তব্য সরকারী সংস্কার প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে এবং ভবিষ্যতে নীতি পরিবর্তনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।



