ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মিখাইলো ফেডোরভ জানিয়েছেন, রাশিয়া সরকার দ্বারা স্টারলিংক সংযুক্ত ড্রোনের ব্যবহার সীমিত করার পর বাস্তব ফলাফল দেখা গেছে। এই পদক্ষেপের মূল চালিকাশক্তি হল স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা এলন মাস্কের দ্রুত প্রতিক্রিয়া, যা ইউক্রেনের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে।
ফেডোরভ এলন মাস্ককে “স্বাধীনতার প্রকৃত রক্ষক” এবং “ইউক্রেনের জনগণের সত্যিকারের বন্ধু” বলে প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, রাশিয়া সরকারের ড্রোনগুলোতে স্টারলিংক সংযোগ পাওয়া গেলে তা তৎক্ষণাৎ বন্ধ করার নির্দেশ পাওয়া মাত্রই এলন মাস্ক পদক্ষেপ নেন।
এলন মাস্কের এক্স (X) প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত বার্তায় তিনি লিখেছেন, “স্টারলিংককে অননুমোদিতভাবে রাশিয়া সরকার ব্যবহার করা বন্ধ করার জন্য নেওয়া পদক্ষেপগুলো ফলপ্রসূ হয়েছে। আরও কিছু করা দরকার হলে জানান।” এই সংক্ষিপ্ত মন্তব্যই স্পেসএক্সের প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপের মূল দিক প্রকাশ করে।
স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক বিশ্বব্যাপী উচ্চগতির ইন্টারনেট সরবরাহ করে এবং ২০২২ সালে রাশিয়া সরকারের পূর্ণমাত্রিক আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে ইউক্রেনের ভূখণ্ডে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে এটি সামরিক যোগাযোগ এবং নাগরিক সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।
রাশিয়া সরকারের ড্রোনগুলো, বিশেষ করে কম দামের কামিকাজে মোলনিয়া-২ মডেল, স্টারলিংক সংযোগের মাধ্যমে রিয়েল-টাইমে নিয়ন্ত্রিত হয়ে ইউক্রেনের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ চালাচ্ছিল। সাম্প্রতিক একটি আক্রমণে চলমান যাত্রীবাহী ট্রেনে আঘাত হানার ফলে ছয়জনের মৃত্যু ঘটেছে, যা স্টারলিংকযুক্ত ড্রোনের ধ্বংসাত্মক প্রভাবকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
এই ড্রোনগুলো কম উচ্চতায় উড়ে, ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মাধ্যমে ধ্বংস করা কঠিন এবং রিয়েল-টাইম নিয়ন্ত্রণের সুবিধা পায়, ফলে প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাদের মোকাবেলায় সীমাবদ্ধ থাকে। ফেডোরভের মতে, এই প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যই রাশিয়া সরকারের ড্রোনকে যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর করে তুলেছে।
ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ ওয়ার জানিয়েছে, জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়া সরকার স্টারলিংক সংযুক্ত মোলনিয়া-২ ড্রোনকে সশস্ত্র করে ব্যবহার শুরু করার পর তাদের যুদ্ধক্ষেত্রের দক্ষতা “গুরুতরভাবে” বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিশ্লেষণটি স্পেসএক্সের হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করেছে।
স্পেসএক্সের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট আরমিয়া ইনফর্মের তথ্য অনুযায়ী, স্টারলিংক টার্মিনালগুলোর গতি সীমা ৭৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ইউক্রেনের ভূখণ্ডে চলমান। এই গতি সীমা ড্রোনের অপারেটরদের রিয়েল-টাইমে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন করে তুলবে, ফলে ড্রোনের কার্যকারিতা হ্রাস পাবে।
গতি সীমা প্রয়োগের ফলে রাশিয়া সরকারের ড্রোনগুলো দ্রুতগতিতে চলতে পারবে না, ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণকারী অপারেটরদের রিয়েল-টাইমে নির্দেশনা দেওয়া কঠিন হবে। এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ড্রোনের আক্রমণ ক্ষমতাকে সীমিত করার একটি কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইউক্রেন সরকারও স্টারলিংক টার্মিনালগুলোর জন্য একটি হোয়াইটলিস্ট প্রস্তুত করছে, যাতে শুধুমাত্র অনুমোদিত ডিভাইসগুলোই নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হতে পারবে। হোয়াইটলিস্টে না থাকা যেকোনো টার্মিনাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিচ্ছিন্ন হবে, যা অননুমোদিত ব্যবহারকে আরোপিতভাবে বন্ধ করবে।
ফেডোরভ উল্লেখ করেছেন, এই হোয়াইটলিস্ট ব্যবস্থা স্পেসএক্সের সঙ্গে সমন্বয়ে বাস্তবায়িত হবে এবং টার্মিনাল নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে। এই পদক্ষেপগুলো স্টারলিংককে ইউক্রেনের নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত এবং নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
সারসংক্ষেপে, এলন মাস্কের নেতৃত্বে স্পেসএক্সের দ্রুত প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপ রাশিয়া সরকারের স্টারলিংক-সংযুক্ত ড্রোনের ব্যবহারকে সীমিত করেছে এবং ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বাস্তব ফলাফল দেখাচ্ছে। গতি সীমা এবং হোয়াইটলিস্টের মতো পদক্ষেপগুলো ড্রোনের কার্যকারিতা হ্রাসের পাশাপাশি ইউক্রেনের সাইবার ও যোগাযোগ নিরাপত্তা শক্তিশালী করছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রযুক্তিগত সমন্বয় যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগের ভূমিকা কীভাবে পরিবর্তন করবে, তা নজরে থাকবে।



