পশ্চিমবঙ্গের একটি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি পাঁচজন রোগী নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। রোগীরা সকলেই একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং তাদের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে। এই ঘটনার পর এশিয়ার বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কোভিড-১৯ সময়ের মতো কঠোর স্বাস্থ্যসেবা ও নজরদারি ব্যবস্থা পুনরায় কার্যকর করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য বিভাগ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিয়েছে। আক্রান্ত রোগীদের আলাদা করে আইসোলেশন করা হয়েছে এবং সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মীরা রোগের বিস্তার রোধে জনসাধারণকে সতর্কতা জানিয়েছেন।
বিমানবন্দরগুলোতে এখন তাপমাত্রা স্ক্যান, স্যানিটাইজার স্টেশন এবং যাত্রীদের স্বাস্থ্য প্রশ্নাবলী বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা পূর্বে কোভিড-১৯ মহামারির সময় সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং এখন পুনরায় প্রয়োগ করা হচ্ছে। লক্ষ্য হল সম্ভাব্য সংক্রমণকে প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত করে বিস্তার রোধ করা।
নিপাহ ভাইরাসের প্রথম স্বীকৃত সংক্রমণ ২০০১ সালে মেহেরপুর জেলায় ধরা পড়ে। তখন থেকে বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে কেস রিপোর্ট করা হয়েছে, যদিও সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। প্রতিটি কেসের পরে তদন্ত চালু হয় এবং রোগের মূল উৎস অনুসন্ধান করা হয়।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই ভাইরাসের প্রধান বাহক ফলখেকো বাদুড় (Pteropus প্রজাতি)। বাদুড়ের লালার মাধ্যমে বা তাদের খাওয়া ফলের রসের মাধ্যমে মানুষ সংক্রমিত হতে পারে। এছাড়া সংক্রমিত ব্যক্তি বা পশুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শেও রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
বছরের পর বছর ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লেও, সাধারণ মানুষের আচরণে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। কাঁচা খেজুরের রস বা বাদুড়ের ফলের অর্ধেক খাওয়া এখনও কিছু অঞ্চলে প্রচলিত। এই ধরনের অভ্যাস রোগের বিস্তারকে সহজ করে তুলতে পারে।
২০২০ সালে Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS) জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, নিপাহ ভাইরাসের সংক্রামকতা পূর্বের ধারণার চেয়ে বেশি হতে পারে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, কোনো সময়ে এটি জনবসতিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রাখে। ফলে, প্রস্তুতি না থাকলে বড় আকারের মহামারিতে রূপ নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন, যদি যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে বাংলাদেশ ও ভারতসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও বিস্তৃত সংক্রমণ ঘটতে পারে। রোগের উচ্চ মৃত্যুহার এবং দ্রুত রোগীর অবনতি এই উদ্বেগকে বাড়িয়ে তুলেছে। তাই, স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো সতর্কতা বাড়িয়ে চলেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ইতিমধ্যে নিপাহ ভাইরাসকে সম্ভাব্য মহামারী সৃষ্টিকারী রোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। যদিও এটি করোনাভাইরাসের মতো দ্রুত ছড়ায় না, তবে একবার ছড়িয়ে পড়লে এর ফলাফল অধিক মারাত্মক হতে পারে। এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
নিপাহ ভাইরাসের মৃত্যুহার অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের রোগের তুলনায় বেশি, এবং রোগীর উপসর্গ দ্রুত গুরুতর হয়ে ওঠে। রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলোতে জ্বর, মাথা ব্যথা এবং শ্বাসকষ্ট দেখা যায়, যা সময়মতো সনাক্ত না হলে দ্রুত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি ঘটতে পারে। তাই, দ্রুত সনাক্তকরণ ও আইসোলেশন অপরিহার্য।
বর্তমানে নিপাহ ভাইরাসের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা টিকাদান পাওয়া যায়নি। চিকিৎসা মূলত সমর্থনমূলক, যেখানে রোগীর শ্বাসযন্ত্রের সহায়তা এবং জ্বর কমানোর জন্য সাধারণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। তাই, রোগের বিস্তার রোধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, যেমন নিরাপদ খাবার গ্রহণ এবং সংস্পর্শ এড়ানো, সবচেয়ে কার্যকর।
জনসাধারণকে আহ্বান করা হচ্ছে, ফলখেকো বাদুড়ের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শ এড়াতে এবং কাঁচা খেজুরের রসের ব্যবহার সীমিত করতে। পাশাপাশি, যেকোনো সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পরীক্ষা করানো উচিত। সতর্কতা ও সচেতনতা বজায় রাখলে নিপাহ ভাইরাসের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।



