১ ফেব্রুয়ারি রবিবার, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তে অনুষ্ঠিত গণভোট‑সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদার) আলী রিয়াজ জুলাই সনদ নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন ভুল তথ্যের বিরোধিতা করেন। সভাটি বিকেল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আয়োজন করা হয় এবং গণভোট প্রচার‑কমিটির মুখ্য সমন্বয়ক রিয়াজের বক্তব্যই মূল আকর্ষণ ছিল।
রিয়াজ প্রথমে ২০১৭ সালে তুরস্কে অনুষ্ঠিত সংবিধান সংশোধনী গণভোটের উদাহরণ দিয়ে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তুরস্কে ১৮টি প্রশ্ন একসাথে উপস্থাপন করা হয়েছিল; তার মধ্যে নির্বাহী ক্ষমতার ব্যক্তিকরণ, আইনসভার ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা হ্রাসের মতো মৌলিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, “যদি একসঙ্গে বহু প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, তবে ভোটারদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে যায়।”
বাংলাদেশের আসন্ন গণভোটে চারটি প্রশ্ন প্রস্তাবিত হয়েছে। রিয়াজ বলেন, কিছু মানুষ তিনটি প্রশ্নে একমত এবং একটিতে না‑একমত হওয়াকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তিনি এই বিষয়টি দুইভাবে বিশ্লেষণ করার আহ্বান জানান: একটি দৃষ্টিকোণ সংবিধানিক, আরেকটি দৃষ্টিকোণ সংযোজিত (কম্পোজিট) নথি হিসেবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “ছোটখাটো ধারা পরিবর্তন করা সম্ভব, তবে দেশের ৫৪ বছরের ইতিহাস, বিশেষ করে গত ১৬ বছর যে কঠিন পরিস্থিতি পার করেছে, তার থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা।”
এজন্য রিয়াজের মতে, সংবিধানের ব্যাপক সংস্কার অপরিহার্য এবং এর কোনো বিকল্প নেই। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “এই সংস্কারকে একটি কম্পোজিট ডকুমেন্ট হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যাতে চারটি প্রশ্নের মধ্যে তিনটি প্রশ্নে একমত এবং একটিতে দ্বিমত থাকা আর প্রশ্নের রূপে না থাকে।”
জুলাই সনদ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া অপপ্রচারের উদাহরণ হিসেবে তিনি দুটি নির্দোষ দাবি উল্লেখ করেন। প্রথমটি ছিল, “কেউ বলছে জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহ’ মুছে ফেলা হচ্ছে।” রিয়াজ স্পষ্ট করে বলেন, “সনদটি ৩৯ পৃষ্ঠার একটি নথি, এবং কোনো পৃষ্ঠায়ই ‘বিসমিল্লাহ’ অপসারণের কোনো ধারা নেই।”
দ্বিতীয়টি ছিল, “কেউ দাবি করছে যে জুলাই সনদে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা হচ্ছে।” রিয়াজ এই কথাটিকে “অবৈধ ও ভিত্তিহীন” বলে খণ্ডন করেন এবং বলেন, “সনদে মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে; কোনো ধারা তা অস্বীকার করে না।” তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের ভ্রান্ত তথ্যের উৎস প্রায়শই অনির্ভরযোগ্য সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বা অপ্রতিষ্ঠিত গোষ্ঠীর প্রচার।
রিয়াজের বক্তব্যের ভিত্তিতে, সরকার গণভোটের আগে জনসচেতনতা বাড়াতে এবং ভুল ধারণা দূর করতে তথ্যভিত্তিক প্রচার চালাবে। তিনি আরও জানান, “প্রতিটি প্রশ্নের পেছনের উদ্দেশ্য ও প্রভাব স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, যাতে ভোটাররা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”
এই সভা এবং রিয়াজের মন্তব্যের পর, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, গণভোটের প্রস্তুতি এখনো চলমান এবং সরকার সংবিধানিক সংস্কারের পাশাপাশি নীতি‑নির্ধারণে ব্যাপক পরামর্শ গ্রহণের প্রক্রিয়া চালু রেখেছে। ভবিষ্যতে, রিয়াজের মতো কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে সরকার কীভাবে তথ্য প্রচার ও জনমত গঠন করবে, তা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
সারসংক্ষেপে, আলী রিয়াজের মন্তব্যে জুলাই সনদ সম্পর্কিত মিথ্যা তথ্যের বিরোধিতা, সংবিধানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং গণভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের পরিকল্পনা স্পষ্ট হয়েছে। এই বিষয়গুলো দেশের রাজনৈতিক আলোচনার মূলবিন্দু হয়ে থাকবে এবং পরবর্তী সময়ে ভোটের ফলাফল ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলবে।



