বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে দেশে প্রবাসী আয় হিসেবে রেমিট্যান্সের মোট পরিমাণ ৩১৭ কোটি ১৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়েছে। এই পরিমাণ ঐতিহাসিকভাবে কোনো এক মাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়ে তুলেছে এবং চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাসিক প্রবাহ হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি ২৩ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে।
বছরের একই সময়ে গত বছর রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ২১৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা থেকে এই বছরের জানুয়ারি মাসে প্রায় ৪৪% বৃদ্ধি দেখা গেছে। বছর-বর্ষে রেমিট্যান্সের প্রবাহে এই উত্থানটি প্রবাসী সম্প্রদায়ের আয় বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের স্থিতিশীলতা নির্দেশ করে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের মুদ্রা রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ডিসেম্বরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার ছিল, যা ঐ মাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়ে তুলেছিল এবং চলতি অর্থবছরের সর্বোচ্চ মাসিক আয় হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্সের শীর্ষস্থানটি গত বছরের মার্চে গড়ে ওঠে, যখন প্রবাসীরা ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার পাঠায়। এই তিনটি মাসের তুলনা রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এবং প্রবাসী সম্প্রদায়ের আর্থিক অবদানের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট করে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩০.৩২ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৩,০৩২ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা দেশের ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট অর্থবছরে সর্বোচ্চ রেকর্ড হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। এই বৃহৎ পরিমাণের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভকে শক্তিশালী করে এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্টের সক্ষমতা বাড়ায়।
রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ বাণিজ্য ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, বিশেষ করে মুদ্রা বাজারে ডলার সরবরাহ বাড়িয়ে স্থানীয় মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। এছাড়া, রেমিট্যান্সের মাধ্যমে গৃহস্থালী খরচ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাহিদা বাড়ায়। তবে রেমিট্যান্সের অতিরিক্ত নির্ভরতা মুদ্রা নীতি পরিচালনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, যদি বৈশ্বিক আর্থিক শর্তে পরিবর্তন আসে।
বৃহৎ রেমিট্যান্স প্রবাহের ফলে ভোক্তা ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং সম্পদের পুনর্বিন্যাস ঘটতে পারে, যা রিয়েল এস্টেট ও গৃহস্থালী যন্ত্রপাতি বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে, রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বাড়তি আয় মুদ্রাস্ফীতি চাপ বাড়াতে পারে, বিশেষত যদি সরবরাহ দিকের উন্নতি না হয়। তাই নীতি নির্ধারকদের জন্য রেমিট্যান্সের ব্যবহারকে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতির কাঠামোগত উন্নয়নে রূপান্তর করা জরুরি।
ভবিষ্যতে রেমিট্যান্সের প্রবাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ শক্তিশালী করা, ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের উন্নয়ন এবং রেমিট্যান্সের খরচ কমানো গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রা বাজারের অস্থিরতা এবং রেমিট্যান্সের নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন ঝুঁকি হিসেবে রয়ে যাবে। এই ঝুঁকিগুলি মোকাবিলায় আর্থিক নীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা কৌশলকে নমনীয় রাখতে হবে।
সারসংক্ষেপে, জানুয়ারি মাসে রেমিট্যান্সের ঐতিহাসিক উচ্চতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন প্রদান করেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে নীতি সমন্বয় এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।



