রংপুরের পীরগঞ্জে দেশের প্রথম ধাতব খননের জন্য পুনরায় কূপ খনন শুরু হয়েছে। শানেরহাট ইউনিয়নের ছোট পাহাড়পুর গ্রাম, ভেলামারী পাথার এলাকায় তিন মাসের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চালু হয়েছে। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে শক্তি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন এবং প্রকল্পের সময়সীমা ও লক্ষ্য তুলে ধরেছেন।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১,২০০ মিটার পর্যন্ত গভীরতা পর্যন্ত খনন করা হবে এবং এতে স্থানীয় শ্রমিকদের নিয়োগের মাধ্যমে আঞ্চলিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকার এই ধরণের খনন কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে, যা দেশের ধাতব সম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের (জিএসবি) উপ-মহাপরিচালক প্রকৌশলী আকবর আলী উল্লেখ করেছেন, ভেলামারী পাথারের বেজমেন্ট শিলা শক্তিশালী এবং এতে লোহা, তামা, নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ এবং স্বর্ণের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অনুসন্ধান সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় যে কোন ধাতু কত পরিমাণে পাওয়া যাবে।
জিএসবির পরিচালক (ভূতত্ত্ব) আরিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, তিন মাসের খনন কাজ চলাকালীন নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে বিশ্লেষণ করা হবে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রকৃত ধাতব সম্পদের পরিমাণ ও গুণমান নির্ধারিত হবে, যা পরবর্তী উত্তোলন পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হবে।
এই এলাকায় ধাতব অনুসন্ধানের ইতিহাস ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর থেকে শুরু হয়। সেই সময় পাকিস্তানের খনিজ সম্পদ বিভাগ স্যাটেলাইট তথ্য ও বিমান থেকে চৌম্বকীয় জরিপের মাধ্যমে ভেলামারী পাথারে ধাতব স্তরের উপস্থিতি সনাক্ত করেছিল। পরবর্তী পর্যায়ে একাধিক ধাপে জরিপ ও ছোটখাটো খনন চালিয়ে লোহা সহ বিভিন্ন ধাতব উপাদানের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।
১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সরকার বৃহৎ পরিসরে অনুসন্ধান চালিয়ে গিয়েছিল, তবে রাজনৈতিক ও আর্থিক সমস্যার কারণে উত্তোলন কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এখন বাংলাদেশ সরকার এই ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে পুনরায় অনুসন্ধান চালু করেছে, যা দেশের ধাতব সম্পদ স্বনির্ভরতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যদি ধাতব সম্পদ নিশ্চিতভাবে বেরিয়ে আসে, তবে রপ্তানি সম্ভাবনা এবং স্থানীয় শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে ইস্পাত, তামা ও অ্যালয় শিল্পে স্বল্পমেয়াদে কাঁচামালের দাম স্থিতিশীল হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেতে পারে।
অন্যদিকে, ধাতব খননের পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পের সময় পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সমন্বয় নিশ্চিত করা হবে বলে সরকারী সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
শক্তি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এই উদ্যোগকে দেশের খনিজ শিল্পের আধুনিকায়ন ও বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। ভবিষ্যতে আরও সমজাতীয় প্রকল্প চালু হলে দেশের মোট ধাতব উৎপাদন ক্ষমতা বাড়বে এবং বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সারসংক্ষেপে, পীরগঞ্জের ধাতব খনন কাজের সূচনা দেশের প্রথম ধাতব খনির পুনর্জাগরণ নির্দেশ করে। তিন মাসের সময়সীমায় ১,২০০ মিটার পর্যন্ত অনুসন্ধান, নমুনা বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্য ধাতব সম্পদের মূল্যায়ন এই প্রকল্পের মূল ধাপ। সফল ফলাফল দেশীয় শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ, রপ্তানি সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে, তবে পরিবেশ ও সামাজিক দিক বিবেচনা করে সঠিক নীতি প্রয়োগ করা জরুরি।



