সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) সংস্কার ঐক্য পরিষদের মহাসচিব সেহেলা সিদ্দিকা, হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কর্মসূচি সম্পর্কে বার্তা শেয়ার করার পর শাস্তিমূলক পদক্ষেপের শিকার হন। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) বৃহস্পতিবার তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করে, যেখানে তিনি ২১ মে গত বছরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনটি স্ট্যাটাস পোস্ট করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেহেলা সিদ্দিকা ওই স্ট্যাটাসগুলোতে কর্মচারীদেরকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদর দফতরে এবং তাদের নিজ নিজ অফিসে নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাটের মাঠপর্যায়ের সকল সহকর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে। একই দিনে রাত ৯টা ৪৩ মিনিটে তিনি আরেকটি বার্তা দিয়ে কর্মসূচির স্পষ্টীকরণ প্রদান করেন, যেখানে তিনি জানান, আগামীকাল (২২ মে) সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।
আইআরডি অনুসারে, সেহেলা সিদ্দিকার এই কার্যক্রমকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাট সংগ্রহের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তিনি দায়িত্বপরায়ণ কর্মচারীদের দাপ্তরিক দায়িত্ব পরিত্যাগ করে, সংগঠকের ভূমিকা পালন করে, যা ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা (৩০এ) এবং একই বিধিমালার ৩২ নং ধারা অনুযায়ী অসদাচরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয় এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে সেহেলা সিদ্দিকার বিরুদ্ধে অসদাচরণ প্রমাণিত হয়। আইআরডি তার মূল বেতন ৭১,২০০ টাকা থেকে দুই ধাপ নিচে নামিয়ে ৬৫,৮২০ টাকা করে লঘুদণ্ড প্রদান করে। এই শাস্তি তার বর্তমান বেতন কাঠামোর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে এবং তার আর্থিক অবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে।
এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপের আগে, কর্মসূচি প্রত্যাহারের পর ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় প্রায় অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বরখাস্ত, অবসর প্রদান এবং অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সরকার ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কর্মসূচি বিরোধে কোনো ধরনের অবৈধ কার্যক্রম সহ্য করা হবে না এবং শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সেহেলা সিদ্দিকার পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন, কর্মসূচি সংক্রান্ত তথ্যের ভুল ব্যাখ্যা ও অনুপযুক্ত প্রচার কর্মচারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে এবং তা রোধের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার ঐক্য পরিষদ, যা কর্মচারীদের অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে গঠিত, তার কিছু সদস্যেরাও এই শাস্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা যুক্তি দেন, কর্মসূচি সংক্রান্ত তথ্যের প্রকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা উচিত এবং শাস্তি প্রয়োগে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা দরকার।
অন্যদিকে, সরকারী দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়, কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করা, বিশেষ করে রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রে, দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই, এমন আচরণকে কঠোরভাবে শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা না ঘটে।
এই ঘটনার পর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কর্মচারীদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং সঠিক তথ্যপ্রচারের জন্য নতুন নির্দেশিকা প্রণয়ন করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এছাড়া, কর্মচারীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, এই ধরনের শাস্তিমূলক পদক্ষেপের ফলে সরকারি সংস্থার মধ্যে শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ বাড়বে এবং ভবিষ্যতে কর্মচারীদের অবৈধ কর্মকাণ্ড কমে যাবে। তবে, একই সঙ্গে কর্মচারীদের অধিকার রক্ষার জন্য যথাযথ প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, সেহেলা সিদ্দিকার বেতন হ্রাসের সিদ্ধান্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মসূচি বিরোধে নেওয়া শৃঙ্খলাবদ্ধ পদক্ষেপের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি সরকারি সংস্থার মধ্যে নীতি-নিয়মের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতিফলন এবং কর্মচারীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে একটি উদাহরণস্বরূপ ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হবে।
এই ঘটনা সরকার ও কর্মচারী উভয়ের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে, যেখানে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়ার গুরুত্ব পুনরায় জোর দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখতে এই ধরনের শাস্তি একটি রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে।



