দক্ষিণ কোরিয়া জানুয়ারি মাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ রফতানি অর্জন করেছে, যা দেশের বাণিজ্যিক শক্তি ও প্রযুক্তি ভিত্তিক রপ্তানি কাঠামোর পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই মাসে রপ্তানি মোট ৬৫.৮ বিলিয়ন ডলার, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৩৩.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রথমবারের মতো এক মাসে ৬০ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে।
এই রেকর্ডের মূল চালিকাশক্তি হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চিপের রফতানি, যা বিশ্বব্যাপী মেমোরি চিপের শীর্ষস্থানীয় প্রস্তুতকারক হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এআই চিপের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে সেমিকন্ডাক্টর রফতানি ২০.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১০২.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মাসিক চিপ রফতানির মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে।
এক মাস আগে, দেশটি ২০.৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের চিপ রফতানি করে একই রেকর্ড স্থাপন করেছিল, যা এই ধারাবাহিক বৃদ্ধির ধারাকে নিশ্চিত করে। এআই চিপের পাশাপাশি, হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা বৃদ্ধির ফলে অটোমোবাইল রফতানি ২১.৭ শতাংশ বাড়ে এবং ৬ বিলিয়ন ডলারে স্থিত হয়েছে। এই প্রবণতা দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি শিল্পের বৈদ্যুতিক রূপান্তরের সফলতা নির্দেশ করে।
প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং ও এসকে ইলেকট্রনিক্সও অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ত্রৈমাসিক মুনাফায় রেকর্ড অর্জন করেছে, যা চিপ ও স্মার্টফোন বাজারে তাদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে পুনর্ব্যক্ত করে। এই কোম্পানিগুলোর লাভজনকতা বৃদ্ধি দেশের রপ্তানি বৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে তাদের গুরুত্ব বাড়ায়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যের উপর শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে সিউল সরকার পার্লামেন্টকে বাণিজ্য চুক্তি অনুমোদন না করার জন্য দোষারোপ করেছে, যা দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
সিউল ও ওয়াশিংটন অক্টোবর মাসে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করলেও, নভেম্বর মাসে সিউলের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জোর দিয়ে বলেছে যে, ঐ চুক্তির জন্য পার্লামেন্টীয় অনুমোদন প্রয়োজন নেই এবং এটিকে আইনি বাধ্যবাধকতার পরিবর্তে একটি সমঝোতা স্মারক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই অবস্থান উভয় দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ঘাটতি প্রকাশ করে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এআই চিপের রফতানি বৃদ্ধির ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রা ও বাণিজ্য ঘাটতি উন্নত হতে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বৃদ্ধি রপ্তানি খরচ বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের বিকল্প অনুসন্ধানে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানি কাঠামোতে এআই চিপ ও বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রধান হয়ে উঠেছে, যা ভবিষ্যতে উচ্চ প্রযুক্তি পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াবে। তবে শুল্ক ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন রপ্তানি প্রবাহকে অস্থির করতে পারে, তাই নীতি নির্ধারকদের জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও বৈচিত্র্যকরণ কৌশল প্রয়োজন।
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার রপ্তানি বৃদ্ধির ধারাকে বজায় রাখতে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর ও এআই প্রযুক্তিতে। এই পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদে দেশের শিল্প ভিত্তি শক্তিশালী করতে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
অবশেষে, রেকর্ড রফতানি সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশের অনিশ্চয়তা ও শুল্ক নীতির পরিবর্তন দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানি কৌশলে সতর্কতা অবলম্বন করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। রপ্তানি বৃদ্ধি ও বাজার বৈচিত্র্যকরণকে সমন্বিত করে দেশটি ভবিষ্যতে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পথে অগ্রসর হতে পারে।



