গাজার মিসর সীমান্তে অবস্থিত রাফা ক্রসিংকে ইসরাইল রবিবার স্থানীয় সময়ে আংশিকভাবে পুনরায় চালু করেছে। মানবিক সংস্থার বহু মাসের আহ্বানের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তবে প্রবেশ-প্রস্থান এখনো সীমিত শর্তে অনুমোদিত। ক্রসিংটি পুনরায় খোলার মূল উদ্দেশ্য বেসামরিক নাগরিক ও মানবিক সাহায্যের গতি ত্বরান্বিত করা।
ইসরাইলের এই পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে গাজার নাগরিকদের চলাচলেও কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। সীমিত সংখ্যক বাসিন্দা ও জরুরি রোগীর জন্যই প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে, অন্য সব ধরনের গমনাগমন এখনো নিষিদ্ধ। এই সীমাবদ্ধতা আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর উদ্বেগের বিষয়, কারণ তারা ক্রসিংকে গাজার মানবিক সংকটের প্রধান রিলিফ গেট হিসেবে বিবেচনা করে।
যদিও গাজার ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়েছে, তবে সংঘর্ষের ঝড় এখনও থেমে যায়নি। ইসরাইলি এবং হামাসের মধ্যে সাম্প্রতিক গুলিবর্ষণ ও বোমাবর্ষণ চলমান, যা রাফা ক্রসিংয়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এই অব্যাহত সহিংসতা ক্রসিংয়ের কার্যকারিতা ও স্থায়িত্বকে প্রভাবিত করতে পারে।
গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থা জানায়, শনিবার ইসরাইলি বিমান হামলায় ৩২ জন নাগরিক নিহত হয়েছে, যার মধ্যে শিশুরাও অন্তর্ভুক্ত। ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করে, এই আক্রমণটি হামাসের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে করা হয়েছে। উভয় পক্ষের এই বিবৃতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
রাফা ক্রসিং গাজার বেসামরিক জনসংখ্যা ও মানবিক সাহায্যের জন্য একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত। মে ২০২৪ সালে ইসরাইলি বাহিনী এই ক্রসিং নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর থেকে এটি সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। বন্ধ থাকা সময়ে গাজার স্বাস্থ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা গুরুতর সংকটে পড়ে, যা আন্তর্জাতিক সংস্থার তীব্র সমালোচনা উত্থাপন করে।
ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় সংস্থা কোগ্যাট রবিবার জানিয়েছে, রাফা ক্রসিং এখন সীমিত সংখ্যক গাজার বাসিন্দার জন্য উন্মুক্ত। এই অনুমোদন মূলত জরুরি চিকিৎসা সেবা ও মানবিক সাহায্যের জন্যই প্রদান করা হয়েছে। সংস্থা উল্লেখ করেছে, ভবিষ্যতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত হলে প্রবেশের পরিসর বাড়ানো হতে পারে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ক্রসিং পুনরায় খোলার পর প্রায় ২০০ রোগী এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। এই রোগীরা মূলত গুরুতর চিকিৎসা প্রয়োজনীয়তা সম্পন্ন, যাদের গাজার ভিতরে যথাযথ সেবা পাওয়া কঠিন। ক্রসিংয়ের আংশিক খোলার ফলে তাদের চিকিৎসা সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
প্রায় ৪০ জন ফিলিস্তিনি গাজার সীমান্তে পৌঁছে মিসরীয় পার্শ্বে অনুমতি চেয়ে অপেক্ষা করছেন, যাতে তারা গাজায় ফিরে কাজ শুরু করতে পারেন। এই দলটি মূলত পুনর্নির্মাণ ও মানবিক কাজের জন্য গাজার ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাচ্ছেন। তাদের প্রত্যাশা হল, সীমিত প্রবেশের সুযোগ বাড়লে গাজার পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে।
ইসরাইলের পূর্বের অবস্থান ছিল, রাফা ক্রসিং পুনরায় চালু হবে না যতক্ষণ না গাজায় আটক ইসরাইলি জিম্মি রান গাভেলির মৃতদেহ ফেরত দেওয়া হয়। গাভেলির দেহাবশেষ কয়েক দিন আগে উদ্ধার করা হয় এবং ইসরাইলে সমাহিত করা হয়। দেহের ফেরত পাওয়ার পর ইসরাইল রাফা ক্রসিং আংশিকভাবে খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই সিদ্ধান্তকে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা পর্যবেক্ষণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন মানবিক সাহায্যের প্রবাহ দ্রুততর করার আহ্বান জানিয়েছে, একই সঙ্গে ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগকে স্বীকার করেছে। মিশরও সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে, যাতে ক্রসিংয়ের ব্যবহার নিরাপদ থাকে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, রাফা ক্রসিংয়ের আংশিক খোলার ফলে গাজার মানবিক সংকট কিছুটা শিথিল হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে ইসরাইল ও হামাসের পারস্পরিক শর্তাবলী, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ, ক্রসিংয়ের পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে। এই প্রেক্ষাপটে রাফা ক্রসিংকে একটি কূটনৈতিক সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনার দিকনির্দেশনা নির্দেশ করবে।



